বর্ষার পানি বাড়তেই চাঁদপুরের গ্রামীণ জনপদের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। নদী-নালা ও খাল-বিল কানায় কানায় ভরে ওঠার পাশাপাশি চরম ব্যস্ততা বেড়েছে নৌকা তৈরির কারিগরদের। দিন-রাত কাঠ কাটার ঠকঠক শব্দ, হাতুড়ির আঘাত আর কারিগরদের ঘামঝরা পরিশ্রমে মুখরিত হয়ে উঠেছে মতলব দক্ষিণের বিভিন্ন হাটবাজার ও সড়কের পাশ। কোথাও আবার রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে অস্থায়ী নৌকার হাট।
পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা- এই চার নদীবেষ্টিত জেলা চাঁদপুর। নদীকূলের এ জনপদে বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকা তৈরির কারুশিল্প। উপজেলার মুন্সীরহাট, নায়েরগাঁও, নারায়নপুর, ধনারপাড়, নাগদা, বরদিয়া, মোবারকদী, ডাকঘর ও বাইশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে ছোট-বড় নতুন নৌকা। পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজও চলছে সমানতালে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কাঠ চিরানো হচ্ছে, কোথাও মাপ অনুযায়ী তক্তা বসানো হচ্ছে, আবার কোথাও পেরেক ও লোহার পাত দিয়ে জোড়া লাগানো হচ্ছে। ক্রেতাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে এসব নৌকা। কেউ গবাদিপশুর ঘাস কাটা, কেউ বিলে মাছ ধরা, আবার কেউ পরিবার নিয়ে বর্ষায় যাতায়াতের জন্য এসব নৌকা কিনছেন।
চরাঞ্চলের মানুষের কাছে সারা বছরই নৌকার চাহিদা থাকে। তবে বর্ষায় এই চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মতলব দক্ষিণে তৈরি এসব ডিঙি ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা শুধু চাঁদপুর নয়, নদীপথে আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ক্রেতারা এসে কিনে নিয়ে যান।
মোবারকদী এলাকার নৌকা ব্যবসায়ী হান্নান প্রধান বলেন, ‘বর্ষা আসার মাস দুয়েক আগে থেকেই আমাদের ব্যস্ততা শুরু হয়। মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠের নৌকার চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ছোট ডিঙি নৌকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। তবে কাঠ ও লোহার সরঞ্জামের দাম বাড়ায় গত বছরের তুলনায় এবার নৌকার দাম কিছুটা বেড়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অর্ডার আসছে, দিন-রাত কাজ করেও সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি।’
নৌকা কিনতে আসা মজিবুর রহমান জানান, সাধারণ মানের একটি ভালো ডিঙি নৌকা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যেও ছোট নৌকা পাওয়া যায়, যা খুব একটা টেকসই হয় না।
নৌকা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ার কথা জানান কারিগর রাসেল। তিনি বলেন, ‘কাঠ নির্বাচন, চিরানো, তক্তা কাটা, মাপা এবং পেরেক ঠোকা- সব মিলিয়ে একটি নৌকা বানাতে একজন কারিগরের অন্তত দু’দিন সময় লাগে। দৈনিক এক হাজার টাকা হাজিরা পাই। জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় আমাদের শ্রমের দাম তেমন বাড়েনি।’
নারায়নপুর গ্রামের সুমন পাটোয়ারী ও আশ্বিনপুরের মো. আবু সাঈদ খান জানান, বর্ষায় এক সিজনের জন্য ১২-১৩ হাতের ছোট নৌকা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় কেনেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, কৃষিপণ্য ও যাত্রী পারাপারের জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাতের বড় শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা তৈরি করতে খরচ পড়ে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
তবে এই মৌসুমি জীবিকা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তায় আছেন কারিগররা। মো. আলমাছ নামে এক কারিগর বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, কাজ করলে পেটে ভাত জোটে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা তৈরি করে কোনোমতে সংসার চালাই। কিন্তু বছরজুড়ে আমাদের তো কাজ থাকে না। সরকার থেকে যদি একটু ঋণের বা সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হতো, তবে আমরা পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।’
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























