যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ড পেতে যাওয়া অভিবাসীদের জন্য নতুন নিয়ম চালু করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নিয়মে সরকারি সহায়তা নেওয়া বা ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আবেদনকারীর গ্রিন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে তা বিবেচনায় নিতে পারবেন অভিবাসন কর্মকর্তারা। নিয়মটি শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এটি ঠেকাতে আদালতে মামলা হয়েছে।
নতুন নিয়মের ফলে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অনেক অভিবাসী ও তাদের পরিবার সরকারি সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের একজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং অন্য সদস্য গ্রিন কার্ডের আবেদন করছেন, তাদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
‘জনস্বার্থের বোঝা’ বলতে কী বোঝায়
গ্রিন কার্ডের আবেদন যাচাইয়ের সময় আবেদনকারী নিজের খরচ নিজে চালাতে পারবেন কি না, তা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বিবেচনা করে আসছেন। সরকারি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন—এমন ব্যক্তিকে ‘জনস্বার্থের বোঝা’ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান দেশটির অভিবাসন আইনে রয়েছে।
অভিযোগ, তদন্তে যা মিলল
১৯৯৯ সালে বিল ক্লিনটন প্রশাসন এই ধারণার একটি সীমিত ব্যাখ্যা দেয়। তখন মূলত নগদ সরকারি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার জন্য দেওয়া সহায়তা বিবেচনায় নেওয়া হতো।
তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে এই সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়। খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সহায়তা ও আবাসন সহায়তার মতো নগদ নয়—এমন সুবিধাকেও বিবেচনায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে আদালতের সিদ্ধান্তের পর জো বাইডেন প্রশাসন সেই নিয়ম বাতিল করে ২০২২ সালে নতুন নিয়ম চালু করে।
এবার কী বদলাচ্ছে
নতুন নিয়মটি ২০২২ সালের বিধান বাতিল করে সরকারি সহায়তা বিবেচনার পরিধি আবার বাড়িয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারী সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন কি না, ভবিষ্যতে নেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে। কোন কোন সুবিধা অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে, তার নির্দিষ্ট তালিকা না দিয়ে নিয়মে বলা হয়েছে, আয় ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে দেওয়া সরকারি সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
এর মধ্যে খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সহায়তা, শিশুদের চিকিৎসা কর্মসূচি, আবাসন সহায়তা, শিশুদের যত্নে সহায়তা এবং শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচির মতো সুবিধা পড়তে পারে।
এমনকি আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যদের জন্য নেওয়া সরকারি সুবিধাও বিবেচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সন্তানদের জন্য নেওয়া সুবিধাও রয়েছে।
বছরে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার আবেদনকারী
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বছরে গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার গ্রিন কার্ড আবেদনকারীকে ‘জনস্বার্থের বোঝা’ সংক্রান্ত যাচাইয়ের আওতায় পড়তে হয়।
তবে নতুন নিয়মের প্রভাব এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ গ্রিন কার্ড না পাওয়ার ভয়ে আবেদনকারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বৈধভাবে পাওয়ার যোগ্য সরকারি সুবিধা নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে পারেন।
স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ছয় ধরনের সরকারি সুবিধা থেকে সরে যেতে পারেন বা এসব সুবিধায় নতুন করে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর মধ্যে চিকিৎসা সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, শিশুদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও কেন্দ্রীয় আবাসন সহায়তা রয়েছে।
অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম সরাসরি প্রযোজ্য নয়, কারণ তারা এসব সরকারি সুবিধার জন্য সাধারণত যোগ্য নন।
শিশু ও পরিবারের ওপর প্রভাবের আশঙ্কা
অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, নতুন নিয়মের কারণে যোগ্য পরিবারগুলোও সরকারি সহায়তা নিতে ভয় পেতে পারে। এর মধ্যে স্কুলের খাবার ও গর্ভবতী নারী, নতুন মা এবং ছোট শিশুদের পুষ্টি সহায়তার মতো কর্মসূচিও রয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত নিয়মের কারণে অভিবাসী পরিবারের প্রায় ৩৭ লাখ সদস্য চিকিৎসা, খাদ্য, আবাসনসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা হারাতে পারেন। এর প্রভাব অঙ্গরাজ্যগুলোর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। গবেষণাটিতে প্রায় ২৭৪০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সর্বোচ্চ ২ লাখ ১২ হাজার কর্মসংস্থান হারানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
২২ অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসির মামলা
নতুন নিয়ম ঠেকাতে নিউইয়র্কের নেতৃত্বে ২২টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি আদালতে মামলা করেছে। নিউইয়র্ক সিটির নেতৃত্বে একদল শহরও আলাদা মামলা করেছে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, অভিবাসীরা ভয় পেয়ে সরকারি সহায়তা নেওয়া বন্ধ করলে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ হারাতে পারে। এতে মিশ্র নাগরিকত্বের পরিবারগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে শহরগুলোর দাবি, নিয়মটি কার্যকর হলে স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য ও আবাসনের ব্যয় তাদের ওপর আরও বেশি চাপতে পারে এবং স্থানীয় শ্রমবাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
নিউইয়র্কের মামলায় আদালত প্রাথমিক শুনানির জন্য ৯ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করেছে। আদালত থেকে নিয়মটি স্থগিত করা না হলে এটি শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
সূত্র: সিএনএন, গালফ কোস্ট নিউজ
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম


















