শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের অনলাইনে আসক্তি উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে অনেকেই বিভিন্ন ধরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। অথচ তারা ধারণাও করতে পারছেন না এই রঙিণ ঝলমলে ডিজিটাল দুনিয়ার পেছনে কতো নির্মমতা লুকিয়ে আছে।
অবাধে মোবাইলফোন সেট ব্যবহার ও ইন্টারনেট সংযোগের সহজলভ্যতায় আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে একটি গ্রাম্য যুবকও পশ্চিমা জীবনযাপন দেখে নিজেও তা-ই করার চেষ্টা করছেন। এরফলে পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের আচার আচরণের মিল না থাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন পরিবার ও স্বজনরা।
বিশেষ করে টিকিটক বা ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়ের পর ঘনিষ্টতা থেকে অপহরণ, হত্যা, ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানির মতো ঘটনা বাংলাদেশে নিয়মিত ঘটছে।
সম্প্রতি ঢাকার অদূরে কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এ ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
অভিযোগ রয়েছে, টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলে অপ্রতিমকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার তদন্তে পুলিশ ভুক্তভোগীর সঙ্গে কয়েকজনের অনলাইন যোগাযোগ, একটি আইফোন ও টিকটক ভিডিও তৈরির প্রসঙ্গ খতিয়ে দেখলেও এই ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, শিশুদের অনলাইন জগত এখন তাদের বাস্তব জীবনের শারীরিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠেছে। কুমিল্লার মতো এমন ঘটনা দেশের প্রতিটি প্রান্তেই ঘটছে।
এরফলে সার্বিক অপরাধের চিত্রও পাল্টে গেছে। দেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির পেছনে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে, গত জুলাই মাসে ফেনী জেলায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে হয়রানির ঘটনা ভিডিও করে টিকটকে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে দেখা করতে গিয়ে খোদ রাজধানী ঢাকার এক কিশোরী কুমিল্লায় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, অনলাইনে অপরিচিতদের সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে পারা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভাব কিশোর-কিশোরীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে দেশে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপে দেখা যায়, দেশের ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। আবার বিএমজে ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার মধ্যে ৮৪ শতাংশের প্রধান মাধ্যমই স্মার্টফোন। এমন বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর আইনি বয়সসীমা নির্ধারণের দিকে ঝুঁকছে।
উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা নিষিদ্ধ করার আইন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ সালের মার্চে এবং মালয়েশিয়া জুনে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ওপর বিধিনিষেধ ও বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করেছে। বিশ্বজুড়ে এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার ঠেকায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের সংশোধিত টেলিযোগাযোগ আইনে প্রযুক্তিগত অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও বয়সভিত্তিক যাচাইয়ের প্রাথমিক বিধান রাখা হলেও অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা এখনো বেঁধে দেয়া হয়নি। ফলে বিদ্যমান আইনি কাঠামো শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা দিতে কতটা সক্ষম, তা নিয়ে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার দিকটি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই তুলে ধরছেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বুলবুল আহমেদ খান গণমাধ্যমকে জানান, কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করে, তা বিকাশমান অবস্থায় থাকে। ফলে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন বা ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জের ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তারা অনুধাবন করতে পারে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের গবেষণাতেও দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম রেজাউল ইসলাম মনে করেন, শুধুমাত্র আইন করে বা বয়সসীমা নির্ধারণ করে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা না গেলেও নির্দিষ্ট বয়সের নিচে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকলে শিশুরা অনেকটাই নিরাপদ থাকবে। তবে বয়স যাচাইয়ের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন জমা দেয়ার ক্ষেত্রে যাতে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেন।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইউ-রিপোর্ট জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ শিশু ও তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া খবর ও নেতিবাচক কনটেন্টকে তাদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ মনে করে এবং অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা কড়া নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
অভিভাবকেরা জানান, পড়াশোনা ও যোগাযোগের প্রয়োজনে সন্তানের হাতে ফোন দিতে হলেও তারা সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শুধু ফোন কেড়ে নেয়া সমাধান নয় উল্লেখ করে তারা জানান, পারিবারিক খোলামেলা যোগাযোগের পাশাপাশি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট শিশুদের শেখা ও যোগাযোগের দরজা খুলে দিলেও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কোনো সমাধান নয়। বরং কঠোর বয়সসীমা নির্ধারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং শিশুদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী সদস্য ইমতিয়াজ বিন হাফিজও মনে করেন, যেহেতু এই প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের সম্পৃক্ততা থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয়, তাই নিরাপত্তার মূল দায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিতে হবে। এই সংকট মোকাবেলায় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর ও অশ্লীল কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে। ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তরুণদের রক্ষা করতে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। একইভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগও বয়স উপযোগী অনলাইন সুরক্ষা ও অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়েছে।
মোহাম্মদ জোবায়ের আহমেদ | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম




















