শুক্রবার, ৩১ মে, ২০২৪

বুধ বৃহস্পতিবার ফের অবরোধ

ফাইল ছবি

একদিন বিরতি দিয়ে আবারও ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ ঘোষণা করছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। সোমবার বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও দলীয় নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে একদিন বিরতি দিয়ে আগামী বুধবার (৮ অক্টোবর) ভোর ৬টা থেকে শুক্রবার (১০ অক্টোবর) ভোর ৬টা পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।

এর আগে গত ২৯ অক্টোবর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং ৩১ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত অবরোধ দেয় বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সমমনা দলগুলো। পরে দ্বিতীয় দফায় অবরোধ দেয়া হয় রোববার (৫ নভেম্বর) সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) সকাল ৬টা পর্যন্ত।

এদিকে সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে টানা কর্মসূচির অংশ হিসেবে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। গত সপ্তাহে একদিন হরতাল ও তিনদিন অবরোধের পর চলতি সপ্তাহের শুরুতেই আবারও চলছে অবরোধ। প্রথম ধাপের অবরোধে রাজধানী ও আশপাশের ১৯ জায়গায় বিভিন্ন যানবাহনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। তবে এবার যানবাহনে আগুন দেয়া রুখতে আগে থেকেই নানান পদক্ষেপ নেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

যদিও এরই মধ্যে শনিবার রাতে, রোববার সকাল ও রাতে, সোমবার রাজধানীর বেশ কয়েক জায়গায় বাসে আগুনের তথ্য এসেছে। এরমধ্যে সোমবার রাজধানীর মিরপুরে যাত্রীবাহী বাসে আগুন, গুলিস্তানে বাসে আগুন, গাজীপুরে ২ বাসসহ অটোরিকশায় আগুন, রাজশাহীতে ট্রাকে আগুন, বগুড়ায় পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে লড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চোরাগুপ্তা হামলা চালানো হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে লক্ষ্যে নতুনভাবে নিরাপত্তার ছক তৈরি করেছে পুলিশ। এর অংশ হিসেবে রাজধানীতে দিনরাত দায়িত্ব পালন করছেন ২০ হাজার পুলিশ সদস্য। নাশকতা রোধে দায়িত্ব পালন করছেন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারাও। একই সঙ্গে আছে র্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মূলত হরতাল-অবরোধে গণপরিবহনে চোরাগুপ্তা হামলা ও আগুন দেয়ার ঘটনাই বেশি ঘটছে। চোরাগোপ্তা হামলা নিয়ে শঙ্কিত পুলিশও। এসব হামলা ও নাশকতা প্রতিরোধে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে ডিএমপি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, অবরোধ কেন্দ্র করে রাজধানীবাসীর নিরাপত্তায় এবার নেয়া হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে দিন ও রাতের রাজধানীকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। রাজধানীতে দিনে প্রায় ১১ হাজার পুলিশ সদস্য এবং রাতে প্রায় ৯ হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। থানা পুলিশ, পুলিশ লাইন্সের সদস্য, ডিবিসহ ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে নিরাপত্তার এ ছক তৈরি করেছে ডিএমপি।

সাধারণত নাশকতা ও বাসে আগুন দেয়ার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে রাতে। বিষয়টি মাথায় রেখে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি রাজধানীতে যে কোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে অপরাধীদের গ্রেফতার অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা যে কোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক নির্দেশ যেন পেতে পারেন, এ লক্ষ্যে এবারই প্রথম রাতে উপ-পুলিশ কমিশনাররা (ডিসি) দায়িত্ব পালন করছেন।

ডিএমপির আটটি ক্রাইম ডিভিশনে একজন করে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এ দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে নিয়মিত দায়িত্ব পালনে প্রতিদিন একজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া চোরাগোপ্তা হামলা ও যানবাহন ভাঙচুর করে কেউ যেন পালিয়ে যেতে না পারে- সেজন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে সাদা পোশাকের পুলিশ।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজধানীর নিরাপত্তা ও জনগণের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নানান পরিকল্পনা নিয়েছে ডিএমপি। এজন্য শনিবার ক্রাইম ও ডিবি পুলিশের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন ডিএমপি কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমান।

বৈঠকের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, অবরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে ডিএমপি কমিশনার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি যে কোনো মূল্যে যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়েছেন।

রাজধানীসহ সারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি ২২৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সোমবার সকালে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো খুদে বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম।

ওই বার্তায় বলা হয়, সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২২৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

অবরোধে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুটে চলা দূরপাল্লার বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাসগুলোতে এস্কর্ট সেবা প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, ‘আজ দ্বিতীয় দিনের অবরোধ চলাকালে যে কোন ধরনের নাশকতারোধে রাজধানীতে ১৬০টি টহল দলসহ সারা দেশব্যাপী র‌্যাবের ৪৬০টি টহল টিম দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত রয়েছে। আমরা সম্মিলিতভাবে টহল দিচ্ছি এবং আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’ 

সোমবার র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এক ভিডিও বার্তায় সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

খন্দকার আল মঈন বলেন, দূরপাল্লার বাসগুলোতে এস্কর্ট সেবা দিচ্ছে র‌্যাব। এছাড়া পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রী পরিবহনের জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। বিভিন্ন দূরপাল্লার পরিবহনগুলোর মালিকদের সঙ্গে আমরা সমন্বয় করছি। দূরপাল্লার বাসগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এস্কর্ট দিয়ে আমরা গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছি। পাশাপাশি নিরাপদ পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।

গার্মেন্টসের শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত শনিবারে র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আমরা বেশ কয়েক জন ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া  এবং গাজীপুর, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে অনেক গার্মেন্টস রয়েছে  সেখানে পরিদর্শন করেছি। সেখানে পরিদর্শন পরবর্তীতে যারা গার্মেন্টস সেক্টরকে নষ্ট করার জন্য সহিংসতা ও নাশকতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর বার্তা দিয়েছি

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন্স) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘৪৮ ঘণ্টার অবরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে পোশাকধারী পুলিশ দিনে এবং রাতে দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এবার রাতের ঢাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতে ডিসিরা দায়িত্ব পালন করবেন। আমাদের গোয়েন্দারাও কাজ করছেন। যে কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই নিরাপত্তার স্বার্থে যত ধরনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, তাতে আমরা পিছপা হবো না। তাতে যদি কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয় তবুও। আমাদের কাছে সবার আগে রাষ্ট্র, দেশের জনগণ। কাজেই নাশকতাকারীকে প্রতিরোধ করতে যত ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, ডিএমপি সব কাজ করবে।’

গত সপ্তাহে একদিনের হরতাল ও তিনদিনের অবরোধে রাজধানীতে বিভিন্ন জায়গায় চোরাগোপ্তা হামলা হয়েছে। যাত্রীবেশে বাসে আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশের নজর এড়িয়ে এসব হামলার ঘটনায় কিছুটা আতঙ্কে নগরবাসী।

সম্পাদক : জোবায়ের আহমেদ নবীন