বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে কূটনীতিক পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নিচ্ছে ভারত

বাংলাদেশ থেকে কূটনীতিক পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নিচ্ছে ভারত

বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশন ও সহকারী হাইকমিশনগুলোতে দায়িত্বরত কূটনীতিক ও অন্য কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ভারতের একাধিক সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এমন পদক্ষেপ নিল ভারত সরকার।

‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণ দেখিয়ে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে থাকা সব মিশন থেকে ‘সরিয়ে নেওয়ার’ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।

কূটনীতির ভাষায় বাংলাদেশকে একটি ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিবেশী দেশটি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও তা ঘোষণা করা হয়নি বলে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।


এ সিদ্ধান্তের অধীনে ঢাকায় দেশটির হাই কমিশনসহ বাংলাদেশে থাকা পাঁচটি মিশনই ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং হবে।


তবে পাঁচটি কূটনৈতিক মিশনই ‘পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম’ চালিয়ে যাবে বলে বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে মঙ্গলবার খবর প্রকাশ করেছে হিন্দুস্তান টাইমস।


প্রতিবেশী দেশটির সংবাদ সংস্থা এএনআই এর বরাতে একই খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়াও। উভয় প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দেওয়া হলেও কারও নাম বলা হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারও বক্তব্যও তুলে ধরা হয়নি।


বাংলাদেশে থাকা ভারতের পাঁচ মিশন হল- ঢাকার হাই কমিশন এবং চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে অবস্থিত চারটি সহকারী হাই কমিশন।


হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর একটি। যুদ্ধের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা পাকিস্তানে বর্তমানে ‘নো চিলড্রেন’ পোস্টিং রাখা হয়েছে, যেখানে শুধু স্বামী বা স্ত্রী কর্মকর্তাদের সঙ্গে থাকার অনুমতি পাচ্ছেন।


দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিক টানাপড়েন ও কিছু ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হওয়া বিক্ষোভের পর উভয় দেশই নয়া দিল্লি ও ঢাকাসহ তাদের মিশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।


ঢাকায় গত ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান শরীফ হাদী নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামে ভারতীয় মিশনের বাইরে সহিংস বিক্ষোভও হয়।


সবশেষ তারকা ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ নিয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনের সপ্তাহ তিনেক আগে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার খবর দিল ভারতের সংবাদমাধ্যম।


এর কারণ হিসেবে হিন্দুস্তান টাইমসকে বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বাংলাদেশে উগ্র ও চরমপন্থি গোষ্ঠীর হুমকি এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে ‘অধিকতর স্বাধীনতা’ দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে কর্মকর্তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।


দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগ ও জনবিক্ষোভ নিয়ে টানাপড়েন চলছে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে।


বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর থেকে চলছে কূটনৈতিক বার্তা বিনিময়। পাল্টাপাল্টি চিঠি চালাচালির মধ্যে একই দিনে দুই দেশের কূটনীতিককে তলবের মত বিরল ঘটনাও ঘটেছে।


ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ফেরাতে কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। দিল্লিতে থেকে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী উসকানি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।


একই সঙ্গে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন করা হচ্ছে বলে একের পর এক অভিযোগ করছে ভারত। এ নিয়ে ভারতে বাংলাদেশ মিশনের সামনে বিক্ষোভ, ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশেও ভারতের মিশনগুলোর সামনে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার।


সবশেষ আইপিএল থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া নিয়ে সম্পর্ক আরও শীতল হয়েছে।


তবে এরই মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের শীর্ষ নেতাদের সফর ও শোকবার্তা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে হঠাৎ উষ্ণ করার চেষ্টার বিষয়টিও সামনে আসে।


এ অবস্থার মধ্যেই ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সপ্তাহ তিনেক আগে ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে থাকা সব মিশন থেকে ‘সরিয়ে নেওয়ার’ সিদ্ধান্ত ভারত নিয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম খবর দিয়েছে।


মঙ্গলবার প্রকাশিত এ খবরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মকর্তারা এমন পদক্ষেপের কারণ হিসেবে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে থাকা কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকার কথা বলেছেন। বিশেষ করে ‘উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর হুমকির’ কারণের কথা তুলে ধরে সিদ্ধান্তটি কিছুদিন ধরেই প্রক্রিয়াধীন থাকার কথা বলেন তারা।


“সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমরা হাই কমিশন ও চারটি সহকারী হাই কমিশনে কর্মরত কর্মকর্তাদের নির্ভরশীলদের ভারতে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি,” যোগ করেন এক কর্মকর্তা।


হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, এসব মিশনের কর্মরতের পরিবারের সদস্যরা কবে নাগাদ আবার বাংলাদেশে আবার ফিরতে পারবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।


বাংলাদেশে কতজন কূটনীতিক রয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে সে বিষয়েও তারা বিস্তারিত বলতে চাননি।

সম্পাদক : অপূর্ব আহমেদ