রমজান মাস সংযম, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে একজন মুমিন কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও নানাবিধ কামাচার থেকে বিরত থাকেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা: ১৮৩)
রোজার মূল চেতনা হলো আল্লাহর নির্দেশ পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করা। সেই লক্ষ্যে ওজু বা গোসলের সময় পানি ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। অসাবধানতাবশত পানি গলার ভেতরে বা খাদ্যনালিতে চলে গেলে রোজার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ বিষয়ে শরিয়তের সঠিক জ্ঞান থাকা প্রতিটি রোজাদারের জন্য অপরিহার্য।
অজু ও গোসলের সময় সতর্কতা
স্বাভাবিক অবস্থায় অজু বা গোসলের সময় নাকে পানি দেওয়া এবং কুলি করা সুন্নত। তবে রোজা অবস্থায় গড়গড়া করে কুলি করা বা নাকের গভীরে পানি টেনে নেওয়া নিষিদ্ধ বা শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত অপছন্দনীয়।
যদি অজু বা গোসলের সময় রোজার কথা স্মরণ থাকা অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে পানি গলার নিচে প্রবেশ করে কিংবা নাক দিয়ে খাদ্যনালিতে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। এক্ষেত্রে ওই রোজার জন্য শুধুমাত্র ‘কাজা’ আদায় করতে হবে (অর্থাৎ রমজানের পর একটি রোজা রাখতে হবে); তবে এর জন্য কোনো ‘কাফফারা’ (টানা ৬০টি রোজা রাখা) ওয়াজিব হবে না। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ৬/২৬০; হিন্দিয়া: ১/২০২; আদ্দুররুল মুখতার: ২/৪০১; ফতোয়ায়ে খানিয়া: ১/২০৯)
হাদিস শরিফের নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (স.) রোজা অবস্থায় অজুর পদ্ধতিতে বিশেষ পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন। লাকিত ইবনে সাবিরা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘অজু বা গোসলের সময় নাকে ভালোভাবে পানি দাও, তবে রোজা অবস্থায় নয়।’ (সূত্র: সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬৩; সুনানে তিরমিজি: ৭৮৫)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, রোজাদার ব্যক্তির জন্য কুলি বা নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন (মুবালাগা) করা ঠিক নয়।
বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি রোজা থাকার কথা একেবারেই ভুলে যান এবং সেই অবস্থায় ভুলবশত গড়গড়া করেন বা পানি পান করে ফেলেন, তবে তার রোজা ভাঙবে না। এমনকি পানি গলার নিচে চলে গেলেও রোজা পূর্ণ থাকবে এবং কোনো কাজা বা কাফফারা আদায় করতে হবে না। কারণ, ভুলে করা কাজকে আল্লাহ ক্ষমা করেছেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ভুলে আহার বা পান করল, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে। কারণ, আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।’ (সূত্র: সহিহ মুসলিম: ১/২০২)
রোজাদারদের জন্য জরুরি পরামর্শ
হালকা কুলি: অজুর সময় মুখ ধোয়া বা হালকাভাবে কুলি করা যাবে, তবে কোনোভাবেই পানি গলার শেষ সীমা পর্যন্ত নিয়ে গড়গড়া করা যাবে না।
চিকিৎসা সংক্রান্ত সতর্কতা: গলাব্যথা বা ইনফেকশনের কারণে যদি গড়গড়া করার প্রয়োজন হয়, তাহলে নিরাপদ থাকার জন্য তা ইফতার ও সাহরির মধ্যে সম্পন্ন করা উচিত।
মানসিক সচেতনতা: অজু বা গোসলের শুরুতে নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত যে- ‘আমি রোজা আছি।’ এই সচেতনতা অসাবধানতাবশত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
রোজার শুদ্ধতা ও পূর্ণতা রক্ষার জন্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অজু বা গোসলের সময় সামান্য অসতর্কতাও একটি ফরজ ইবাদতের পথে অন্তরায় হতে পারে। তাই হাদিসের নির্দেশনা অনুসরণ করে গড়গড়া ও নাকে পানি দেওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের সবার সিয়াম সাধনাকে কবুল করুন। আমিন।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম






















