নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও আনন্দের বদলে নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার ছায়া। আগাম বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে অনেক নিচু জমি। ফলে পাকা ধানের মাঠজুড়ে এখন ক্ষতির চিত্রই বেশি। কৃষকদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়েও ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট ও শ্রমিকের অভাব। সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তার চাপ নিয়ে হাওরের কৃষকদের জন্য ফসল ঘরে তোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলাবদ্ধতায় আটকে যন্ত্রের ব্যবহার
ক্ষেতে যন্ত্র ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা চাপ বাড়িয়েছে কৃষকদের। ধান কাটার কাজ পুরোদমে শুরু হলেও সব জায়গায় যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। পানিতে ডুবে থাকা জমিতে কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে কৃষকদের বাধ্য হয়ে বেশি খরচে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের লাভ আরও কমে যাচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ লাখ ৮৬ হাজার টন ধান। রোববার (১২ এপ্রিল) এসব ক্ষেতের ধান কাটতে শুরু করেন কৃষকরা। তবে চৈত্রের মাঝামাঝি সময় থেকে বৃষ্টি হওয়ায় হাওরের নিচু জমিতে পানি জমেছে। সরকারি হিসাবে ১ হাজার ১২০ হেক্টর জমির কাঁচা ধান পানিতে নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষকরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। যেসব ক্ষেতে পানি জমেছে, সেখানে কম্বাইন্ড মেশিনে ধান কাটা যাবে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় সবকটি হাওরসহ নিম্নাঞ্চলে এবার ৪১ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধান বেশি। এসব ধানের জীবনকাল ১৪৫ দিন। শ্রমিকের পাশাপাশি ৭ শতাধিক কম্বাইন্ড হারভেস্টারে ধান কাটা চলছে। এর জন্য উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ১২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন। এখানে কোনো পেট্রোল বা ডিজেলের পাম্প নেই। তবে এই যন্ত্রে জ্বালানি তেলের সংকট যাতে না হয়, সেজন্য প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক কোনো রকম দুর্যোগ না হলে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে হাওরের শতভাগ জমির ধান কাটা সম্ভব।
কলমাকান্দার বড়খাপন ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, মেদারবিল হাওরে কয়েক হাজার একর বোরো ধান জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে গেছে। যে জমির ধান টিকে আছে সেখানে মেশিনে ধান কাটা যাবে না। বাধ্য হয়ে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হবে। এতে খরচ অনেক বাড়বে।
নেই বন্যার পূর্বাভাস
কৃষকরা জানান, প্রতিদিন রাতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হওয়ায় ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা। ভারী বৃষ্টিতে আগাম বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে পুরো হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা কৃষকদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তিনি বলেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস নেই। এ সময় সুনামগঞ্জে ও উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জীতে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। কৃষকরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য তারা ছুটি বাতিল করে সর্বক্ষণ মাঠে আছেন।
বিশেষ প্রতিনিধি | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























