গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ স্টেভিয়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম স্টিভিয়া রিবাউডিয়ানা।
চিনির চেয়েও ৪০০ গুণ বেশি মিষ্টি হলেও এটিকে বলা হয় প্রাকৃতিক চিনি।
অনেকটা তুলশীর মতো দেখতে এই সবুজ উদ্ভিদটি দেশের কৃষকদের কাছে ‘মধু গাছ’ বা ‘চিনি পাতা’ নামেও সমান পরিচিত।
দেশের কৃষিতে নতুন চমক হিসেবে বলা হচ্ছে এই স্টেভিয়াকে। পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা আসায় রাজশাহীতে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়েছে উচ্চমূল্যের এই ফসল।
তিন মাস পরপর সংগ্রহ করা যায় এই গাছের পাতা। আর গাছ থেকে ছিঁড়তে হয় চা-পাতা বা তুলশী পাতার মতো করেই।
এরপর তা শুকিয়ে গুঁড়ো করে ব্যবহার করতে হয়। তবে এর কাঁচা পাতা গরম পানিতে দিলেও পাওয়া যাবে চিনির মতোই মিষ্টি স্বাদ। এর এক কেজি গুঁড়ো ৪০ থেকে ৫০ কেজি চিনির সমান। তাই বলা হচ্ছে ‘স্টেভিয়া’ চিনির চেয়েও ৪০০ গুণ বেশি মিষ্টি।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৫ কোটি মানুষ চিনির বিকল্প হিসেবে স্টেভিয়া ও এর নির্যাস ব্যবহার করছেন। ১৮৯৯ সালে পর্তুগাল ও ব্রাজিলের পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ধান মেলে এই উদ্ভিদের। এরপর চীন ও নেপালে এবং ভারতের আসামে চাষ শুরু হয় স্টেভিয়ার। এরই মধ্যে নতুন এই ফসলটি দেশের কৃষকদেরও স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
স্টেভিয়ায় ক্যালোরি না থাকায় এই ভেষজ নিয়ন্ত্রণে রাখে রক্তে শরীরের শর্করার পরিমাণ। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকেই এটি খেয়ে থাকেন মিষ্টির বিকল্প হিসেবে। এটি নিয়মিত খেলে ক্যাভিটি ও দাঁতের ক্ষয় রোধ হয়। নিয়ন্ত্রণে থাকে ওজন, ভালো থাকে হার্ট। প্রতিরোধ করে ক্যান্সারের জীবাণুও। তবে এমন সব স্বাস্থ্য উপকারিতা থাকলেও উদ্ভিদটির পক্ষে-বিপক্ষে আছে নানান মত।
এই অবস্থায় রাজশাহীতে স্টেভিয়ার চাষাবাদ বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে কৃষি বিভাগ।
বর্তমানে রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা ও চারঘাটের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে চাষ হচ্ছে স্টেভিয়ার। এরই মধ্যে সেখানে হয়েছে টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে স্টেভিয়ার চারা উৎপাদনের প্রশিক্ষণও। প্রতি কেজি কাঁচা অথবা শুকনো পাতার গুঁড়ো ২ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বলা হচ্ছে উচ্চমূল্যের এই ফসল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করলে প্রতি হেক্টর জমিতে লাভ হবে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে স্টেভিয়ার পরীক্ষামূলক চাষাবাদে সফলতা আসায় রাজশাহীতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছেন রাজশাহীর অনেক কৃষি উদ্যোক্তা। উৎপাদন খরচ কম। এর চাষাবাদ পদ্ধতিও সহজ। সারা বছর রোপণ করা সম্ভব। তাই এখন অনেকেই জমির পাশাপাশি রোপণ করছেন বাড়িতেও।
জানতে চাইলে কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা আতাউর রহমান রেন্টু বলেন, বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরই) এর সার্বিক সহযোগিতা ও পর্যবেক্ষণে ২০২৩ সালে প্রথম তিনি স্টেভিয়ার চাষ শুরু করেন। এতে সফলতা আসায় তিনি এখন বাণিজ্যিকভাবে স্টেভিয়া চাষ শুরু করেছেন। তিন মাস পরপর এর পাতা সংগ্রহ করা যায়। তুলশী পাতার মতই গাছ থেকে পাতা ছিড়ে রোদে শুকিয়ে ব্লেন্ডারে গুড়া করা হয়। এরপরই তা ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠে। তবে এর কাঁচা পাতাও গরম পানিতে মেশালে মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়। আর চিনির চেয়ে মিষ্টি বেশি হলেও এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। বাজারে দাম ভালো পাওয়ায় এর চাষাবাদ বাড়তে চান বলেও উল্লেখ করেন এই কৃষি উদ্যোক্তা।
চারঘাটের বালিয়াডাঙ্গার কৃষি উদ্যোক্তা মো. হিমেল জানান, দেশের মাটিতে স্টেভিয়া চাষ নতুন চমক। দীর্ঘদিন গবেষণার পর স্টেভিয়া চাষে সফলতা মিলেছে। এটি উচ্চ মূল্যের একটি ফসল। চিনির বিকল্প হিসেবে এটি এরই মধ্যে অনেকের কাছে ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয়। যতই দিন যাচ্ছে এর চাহিদা বাড়ছে। তাই স্টেভিয়া চাষ তাদের কাছে আশাজাগানিয়া ফসল হয়ে উঠেছে।
এটি কৃষি ও কৃষকের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। তাই তিনিও বিএসআরআই এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে স্টেভিয়া চাষ শুরু করছেন। তার দেখাদেখি এখন অন্যরাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলেও জানান, তরুণ এই কৃষি উদ্যোক্তা।
এদিকে কৃষি গবেষক ও কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু স্টেভিয়া চাষের জন্য উপযোগী। চারা রোপণের পরই বেড়ে উঠছে এই গাছ। কেবল রাজশাহীতেই নয়, মাটি পরীক্ষা করে অন্য অঞ্চলেও হতে পারে সম্ভাবনাময়ী এই স্টেভিয়ার চাষ।
বিশেষ প্রতিনিধি | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























