বাংলাদেশের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন জোরদার এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই ব্যবস্থাপনা দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।
আজ ঢাকায় অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশনস (এপিসি)-এর সহায়তায় ভয়েস আয়োজিত “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়” শীর্ষক অ্যাডভোকেসি সভায় উপরোক্ত কথাগুলো বলেন বক্তারা
সভায় ভয়েস ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন করে, যেখানে বিধিমালার আনুষ্ঠানিক অনুসরণ এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান উঠে আসে। জরিপে অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত এবং প্রশাসনিকভাবে সচ্ছতা প্রকাশ করলেও কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চিত্রটি অত্যন্ত দুর্বল। মাত্র ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের টেক-ব্যাক ব্যবস্থা রয়েছে এবং একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বিপজ্জনক ঝুঁকির মানদণ্ড অনুসরণ যাচাই করে। গত অর্থবছরে কোনো প্রতিষ্ঠানই মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করেনি বা সংরক্ষণ ও রেকর্ড সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা বজায় রাখেনি। এর ফলে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর ১০ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়, যার কারণে প্রতিবছর আনুমানিক ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে।
মূল্যায়নের ফলাফল উপস্থাপন করে ভয়েস-এর বন্ধন দাস বলেন, “আমাদের মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি অর্জন করেছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অনেকাংশেই অকার্যকর। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, উৎপাদকদের জবাবদিহিতা এবং কার্যকর সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ছাড়া ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার প্রত্যাশিত পরিবেশগত সুফল অর্জন সম্ভব হবে না।”
ভয়েস-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ সংগঠনটির দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভয়েস গবেষণা, অ্যাডভোকেসি এবং নীতিগত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য সংকটের প্রতি গুরুত্ব আরোপে কাজ করে আসছে। ২০২১ সালে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর অর্থবহ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর আমিনুর রসুল বলেন, “ই-বর্জ্য কেবল একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি সম্পদ ব্যবস্থাপনারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মূল্যও সৃষ্টি করতে পারে।”
বাংলাদেশ উই সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা আক্তার ঊল আলম বলেন, “বাংলাদেশে আমদানি হওয়া অনেক ইলেকট্রনিক পণ্য ও উপাদানে ব্যবহৃত মূল্যবান উপকরণ ইতোমধ্যে বিদেশেই পুনরুদ্ধার ও পরিশোধিত করা হয়। ফলে সম্পদ পুনরুদ্ধারের অর্থনৈতিক সুবিধা বিদেশেই থেকে যায়, আর বাংলাদেশকে পণ্যের জীবনচক্রের শেষে সৃষ্ট পরিবেশগত বোঝা বহন করতে হয়।”
মানবিক ও পরিবেশগত দিকটি তুলে ধরে ভয়েস-এর উপপরিচালক (প্রোগ্রামস) মোশাররাত মাহেরা বলেন, “বর্তমান সরকারের বিভিন্ন অগ্রাধিকারের মধ্যে জলবায়ু কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সঠিক ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এটি সবার যৌথ দায়িত্ব, এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত সহযোগিতা ছাড়া অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব নয়।”
সভায় উপস্থিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা বিদ্যমান বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে উন্নত সমন্বয়, উৎপাদকদের সম্প্রসারিত দায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং মানুষ ও পরিবেশ উভয়কে সুরক্ষা দেয় এমন একটি সারকুলার ইকোনোমির অধিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন জোরদার এবং বিচ্ছিন্ন ও অনানুষ্ঠানিক চর্চা থেকে জবাবদিহিমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশগতভাবে টেকসই ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























