ভালোবাসার সম্পর্ক মানেই যে সবসময় হাসিখুশি মুহূর্ত, এমন নয়। মতের অমিল, অভিমান কিংবা ছোটখাটো তর্ক প্রতিটি সম্পর্কেই থাকে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন একটি সাধারণ মতবিরোধ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। অনেক সময় এর জন্য বড় কোনো ঘটনা নয়, বরং কথাবার্তার কিছু ভুল অভ্যাসই দায়ী থাকে। সামান্য সচেতনতা ও সংযম সম্পর্ককে অযথা তিক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
বেশিরভাগ সম্পর্কেই দূরত্ব সৃষ্টি হয় কথার কারণে। কীভাবে এমনটা হয়? কথার ভুল এড়াতে করণীয় কী? চলুন জেনে নিই-
অপরপক্ষের বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই নিজের বক্তব্য তুলে ধরা
অনেকেই তর্কের সময় সঙ্গীর কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে শুরু করেন। এতে অপর ব্যক্তি মনে করেন, তার অনুভূতি বা মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়ে। সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একজনের কথা মনোযোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত শোনা সম্মান ও আস্থার প্রকাশ। এতে সমস্যার প্রকৃত কারণও সহজে বোঝা যায়।
ভুল মন্তব্য করা
আরেকটি সাধারণ ভুল হলো, "তুমি সব সময় এমন করো" বা "তুমি কখনোই এটা করো না" ধরনের মন্তব্য করা। বাস্তবে এমন কথা খুব কম ক্ষেত্রেই সত্যি হয়। কিন্তু এসব শব্দ অভিযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং অপরজন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যান। ফলে সমস্যার সমাধানের বদলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
পুরনো ভুল টেনে আনা
বর্তমান সমস্যার সঙ্গে পুরনো ভুল টেনে আনার অভ্যাসও সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। হয়তো আজকের বিষয়টি ছোট ছিল, কিন্তু আগের নানা ঘটনার হিসাব একসঙ্গে তুলে ধরলে আলোচনা মূল বিষয় থেকে সরে যায়। এতে দুজনের মধ্যেই ক্ষোভ জমতে থাকে এবং কোনো সমস্যারই কার্যকর সমাধান হয় না। তাই যে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটিতেই মনোযোগ রাখা বেশি ফলপ্রসূ।
অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেওয়া
অনেক সময় আমরা সঙ্গীর উদ্দেশ্য বা মনোভাব সম্পর্কে নিজের মতো করে ধারণা করে নিই। তিনি কেন এমন বললেন বা করলেন, তা না জেনেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ভুল বোঝাবুঝির বড় কারণ। অনুমান করার বদলে সরাসরি জানতে চাওয়া এবং খোলামেলা আলোচনা করলে সম্পর্ক অনেক বেশি স্বচ্ছ থাকে।
প্রতিযোগিতার মনোভাব রাখা
তর্ককে অনেকেই জয়-পরাজয়ের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেন। কে শেষ পর্যন্ত ঠিক প্রমাণিত হবে, সেটিই তখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সুস্থ সম্পর্কে জেতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যার সমাধান এবং একে অপরকে বোঝা। যদি একজন জিতে যান আর অন্যজন মানসিকভাবে আহত হন, তবে সেই জয় সম্পর্কের জন্য কোনো লাভ বয়ে আনে না।
কথার ভুল এড়াতে করণীয়
বিরতি নিন
রাগের বশে বলা কথাও দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। তীব্র আবেগের মুহূর্তে কঠিন বা কষ্টদায়ক কথা বলে ফেলা সহজ, কিন্তু সেই কথার ক্ষত অনেক সময় দীর্ঘদিন থেকে যায়। তাই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কিছু সময় বিরতি নেওয়া, নিজেকে শান্ত করা এবং পরে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
মনোযোগ দিয়ে শুনুন
শুধু শোনা আর মন দিয়ে শোনার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। অনেকেই সঙ্গীর কথা চলাকালেই নিজের উত্তর কী হবে, তা ভেবে রাখেন। এতে প্রকৃত অর্থে শোনা হয় না। পুরো মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রশ্ন করা এবং অপরজনের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া সম্পর্কের পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়াকে আরও শক্তিশালী করে।
সম্পর্কে মতবিরোধ এড়ানো সব সময় সম্ভব নয়, আবার সেটি প্রয়োজনও নেই। বরং মতের অমিলকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। সম্মান, ধৈর্য, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দোষারোপের বদলে সমাধানের পথ খোঁজার অভ্যাস ছোটখাটো ঝগড়াকেও ইতিবাচক আলোচনায় পরিণত করতে পারে।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বড় কোনো কৌশলের চেয়ে প্রতিদিনের এই ছোট ছোট যোগাযোগের অভ্যাসই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























