বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

বন্যায় ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারালে কী প্রতিদান?

বন্যায় ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারালে কী প্রতিদান?

ইসলামের দৃষ্টিতে বন্যায় ঘরবাড়ি বা সম্পদ হারানো একজন মুমিনের জন্য ধৈর্যের পরীক্ষা। তিনি ধৈর্য ধারণ করলে এটি গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আখেরাতে মহান প্রতিদানের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য সহিহ হাদিসের আলোকে শহীদের মর্যাদা লাভের আশা করা যায়।


ভয়াবহ বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জীবনের সব সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খোলা আকাশের নিচে আশ্রয়হীন মানুষের হৃদয়ে তখন হাহাকার নেমে আসা স্বাভাবিক। এমন কঠিন সময়ে একজন মুমিনের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- এই অপূরণীয় ক্ষতির কি কোনো প্রতিদান আছে? ইসলাম এ বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়?


পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত শিক্ষা হলো- মুমিন যদি এমন কঠিন বিপদে ধৈর্য ধারণ করেন এবং আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন, এই ক্ষতি তার জন্য গুনাহ মাফ, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আখেরাতে মহান প্রতিদানের কারণ হতে পারে।


বিপদ ঈমানের পরীক্ষা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সম্পদের ক্ষতি সব সময় অমঙ্গলের নিদর্শন নয়; অনেক সময় এটি ঈমানের পরীক্ষা।


মহান আল্লাহ বলেন- ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৫)



পরবর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের জন্য রহমত ও হেদায়াতের সুসংবাদ দিয়েছেন। (সুরা বাকারা: ১৫৬-১৫৭)


সম্পদ আল্লাহর আমানত

দুনিয়ার সব সম্পদই মূলত আল্লাহর দেওয়া আমানত। তিনি তাঁর হিকমত অনুযায়ী কাউকে সম্পদ দান করেন, আবার তাঁর ইচ্ছায় তা ফিরিয়েও নেন। তাই সম্পদ হারিয়ে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।


উম্মে সালামাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) যেকোনো মুসিবতের সময় এই দোয়া পড়তে শিক্ষা দিয়েছেন- اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَاخْلُفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا


উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা'জুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়াখলুফ লি খাইরাম মিনহা। অর্থ: হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। (সহিহ মুসলিম: ৯১৮) বি.দ্র: দোয়াটি পড়ার আগে ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়া হাদিসের শিক্ষা।


বিপদের কষ্ট গুনাহ মাফের কারণ

বন্যার পানিতে ভিজে থাকা, আশ্রয়ের অভাব, ক্ষুধা বা দুশ্চিন্তা মুমিনের প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।


রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, শোক, কষ্ট কিংবা যন্ত্রণা আসে- এমনকি একটি কাঁটার আঘাতও; এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহগুলো মাফ করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম)



বন্যায় মৃত্যু ও আখেরাতের শহীদি মর্যাদা

বন্যায় সম্পদ হারানো যেমন কষ্টের, তার চেয়েও বড় কষ্ট প্রিয়জনকে হারানো। সহিহ হাদিসে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীকে শহীদের মর্যাদাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘শহীদ পাঁচ প্রকার... তাদের মধ্যে একজন হলো পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী।’ (সহিহ বুখারি: ২৮২৯; সহিহ মুসলিম)


তাই যদি কেউ বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন, তবে সহিহ হাদিসের আলোকে তার জন্য আখেরাতে শহীদের মর্যাদা লাভের আশা করা যায়। তবে চূড়ান্ত প্রতিদান ও মর্যাদা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই নির্ধারণ করবেন।


বিপদ মানেই কি আল্লাহর গজব?

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলেই অনেকেই সেটিকে আল্লাহর গজব বা শাস্তি বলে প্রচার করেন। তবে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর গজব বলা যায় না।


এ ধরনের ঘটনা কারও জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে, আবার কারও জন্য ঈমানের পরীক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমও হতে পারে। তাই দুর্যোগের সময় অন্যদের নিয়ে মন্তব্য না করে নিজের আমল সংশোধন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ইসলামের শিক্ষা।


আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোও ইবাদত

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি বড় ধরনের ইবাদতও।


রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুসলিমের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮০)


তাই খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।


একজন মুমিনের কাছে বন্যায় হারিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি বা সম্পদই শেষ কথা নয়। যদি সে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে দুনিয়ার এই ক্ষতি আখেরাতে মহান প্রতিদানের কারণ হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন- ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার: ১০)


তাই এই কঠিন সময়ে হতাশ না হয়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা, ইস্তেগফার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব।


তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ১৫৫–১৫৭; সুরা জুমার: ১০; সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

সম্পাদক : আবদুল মাতিন