শরীরে কোনো সংক্রমণ বা আঘাতের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা সক্রিয় হলে প্রদাহ তৈরি হয়। তবে, এই প্রতিক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। এমনকি হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ডিমেনশিয়া ও ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। খাবারের ধরনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের প্রভাব পড়তে পারে। তাই কিছু খাবার নিয়মিত খাওয়ার পাশাপাশি প্রদাহ বাড়াতে পারে এমন খাবার কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট কী?
হার্ভার্ড-সংশ্লিষ্ট বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের পুষ্টিবিদ জিন লুঙ্গো বলেন, আসলে ‘অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ডায়েট’ নামে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি খাদ্য তালিকা নেই। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ মোকাবিলায় সবচেয়ে ভালো পদ্ধতিগুলোর একটি হতে পারে ভূমধ্যসাগরীয় ধাঁচের খাবার।
এই খাদ্যতালিকায় থাকে ফল ও শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডালজাতীয় খাবার, বাদাম, বীজ, অলিভ অয়েলের মতো অসম্পৃক্ত চর্বি এবং অল্প পরিমাণ দুগ্ধজাত খাবার ও চর্বি কম থাকা প্রোটিন। উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যতালিকা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ড্যাশ ডায়েটেও প্রদাহ কমাতে পারে—এমন খাবারই বেশি থাকে। তবে, এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শুধু একটি বা দুটি খাবার নয়, বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদাহ কমাতে পাতে রাখবেন যেসব খাবার
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: চর্বিযুক্ত মাছ যেমন টুনা, স্যামন, সার্ডিন ও ম্যাকারেলে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সয়াবিন, চিয়া বীজ, আখরোট, তিসির তেল এবং পালং শাক, কলার্ড গ্রিনস ও কেলের মতো সবুজ পাতাযুক্ত সবজিও এর ভালো উৎস।
পলিফেনল: উদ্ভিদজাত এই উপকারী উপাদান উজ্জ্বল রঙের খাবারে বেশি থাকে। ব্লুবেরি ও ব্ল্যাকবেরি ছাড়াও চা, কফি, ডার্ক চকলেট, আপেল, বিভিন্ন সাইট্রাস ফল, পেঁয়াজ ও সয়াবিনে পলিফেনল রয়েছে।
ফাইবার: ডাল, পূর্ণ শস্য যেমন ওটস, ব্র্যান ও বার্লি, ফল এবং শাকসবজিতে প্রচুর ফাইবার থাকে।
অসম্পৃক্ত চর্বি: আখরোট, কাঠবাদাম ও অন্যান্য বাদাম, তিল ও কুমড়ার বীজ এবং অ্যাভোকাডো, অলিভ, ক্যানোলা, তিসি ও আখরোটের তেলের মতো উদ্ভিজ্জ তেলে স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি পাওয়া যায়।
প্রো-বায়োটিক: দই ও কেফিরের (দুধের তৈরি দইয়ের মতো একটি পানীয়) পাশাপাশি ফ্রিজে রাখা সাওয়ারক্রাউট (বাঁধাকপি ও লবণ দিয়ে গাঁজানো) ও অন্যান্য ফারমেন্টেড বা প্রাকৃতিকভাবে গাঁজানো সবজিতে উপকারী অণুজীব থাকে। এগুলো অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য ও কার্যক্রম বাড়াতে সাহায্য করে।
যেসব খাবার কমাবেন
মাইক্রোওয়েভে গরম করে খাওয়ার প্রস্তুত খাবার, চিকেন নাগেট, শুকনো স্যুপ, চিনিযুক্ত সিরিয়াল, বিস্কুট ও বিভিন্ন সসের মতো অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণ, বাড়তি চিনি ও কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকতে পারে। এসব উপাদান প্রদাহ বাড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
লুঙ্গোর পরামর্শ, “উপকরণের তালিকাটি দেখুন। যার মধ্যে এমন উপাদান আছে, যেটা আপনি পড়তে বা চিনতে পারছেন না, তাহলে খাবারটি সম্ভবত ভালো পছন্দ নয়।”
এছাড়া, লাল মাংস—যেমন স্টেক ও বার্গার—এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস যেমন বেকন, হট ডগ, সসেজ ও বিভিন্ন ডেলি মিট কমানো বা এড়িয়ে চলা ভালো। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো ডুবো তেলে ভাজা খাবারের বদলে ভাপে, সেদ্ধ, রোস্ট বা অল্প তেলে দ্রুত ভাজা খাবার বেছে নেওয়া স্বাস্থ্যকর।
সাদা ভাত, সাদা পাউরুটি ও বিভিন্ন বেকারি পণ্যের মতো পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট, চিনিযুক্ত কোমল পানীয় ও অন্যান্য মিষ্টি পানীয়ও কমাতে হবে। পাশাপাশি মার্জারিন, শর্টেনিং ও লার্ডের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে অভ্যাসটা ধরে রাখবেন?
ফল ও সবজি বাড়ান: অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাদ্যাভ্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে ফল ও শাকসবজি। ২০২৫ সালের খাদ্য নির্দেশিকায় প্রতিদিন দুই সার্ভিং ফল ও তিন সার্ভিং সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সহজ উপায় হলো—প্রতিটি খাবারের সময় প্লেটের অর্ধেক ফল, সবজি অথবা দুটির সমন্বয়ে রাখার চেষ্টা করা।
যোগ করুন, কমান বা বদলে নিন: সারা দিনে খাবারের সঙ্গে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাবার যোগ করা যায়। যেমন নাশতায় আপেল, কাটা লাল বা কমলা ক্যাপসিকাম হুমাসের সঙ্গে খাওয়া কিংবা রাতের খাবারের সঙ্গে অলিভ অয়েলের ড্রেসিং দেওয়া পাতাযুক্ত সবজির ছোট সালাদ রাখা।
অন্যদিকে, প্রদাহ বাড়াতে পারে এমন খাবারের পরিমাণ ও খাওয়ার সংখ্যা কমাতে হবে। প্রতিদিন আলুর চিপস খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সপ্তাহে দুই দিনে নামিয়ে আনা যেতে পারে। মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করলে কুকি বা পাইয়ের বদলে হিমায়িত আম গলিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
নতুন স্বাস্থ্যকর খাবার চেষ্টা করুন: বাজারে গেলে পরিচিত খাবারের পাশাপাশি মাশরুম বা স্নো পির মতো নতুন কিছু কিনে দেখতে পারেন। কাঁচা ভালো না লাগলে রান্না করে চেষ্টা করুন। তাতেও পছন্দ না হলে অন্য স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন। কারণ স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেকের কোনো খাবার তিন-চারবার পর্যন্ত চেষ্টা করতে হয়।
মসলা ও ভেষজ বেশি ব্যবহার করুন: ফল ও সবজির মতো রসুন, আদা, রোজমেরি, মরিচ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও হলুদেও প্রাকৃতিক প্রদাহরোধী উপাদান রয়েছে।
খাবারের পাশাপাশি জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু খাবারের দিকে নজর দিলেই হবে না। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে স্বাস্থ্যকর ওজন ধরে রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান বন্ধ করা, অ্যালকোহল কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বায়বীয় ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটা, দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ থেকে ৬০ মিনিট নিজের পছন্দের শারীরিক কর্মকাণ্ড করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ধূমপানের সঙ্গে শরীরে প্রদাহের বিভিন্ন রক্তচিহ্ন, যেমন সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (সিআরপি) ও ফাইব্রিনোজেনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্যানসার, এমফিসেমা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার পেছনেও দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের ভূমিকা থাকতে পারে।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল ও একসঙ্গে অনেকটা পান করাও প্রদাহ বাড়ায়। তাই দিনে একটির বেশি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অ্যালকোহল যত কম খাওয়া যায়, ততই ভালো। ঘুমের দিকেও নজর দিতে হবে। ভালোভাবে ঘুম না হলে শরীরে কর্টিসল নামের হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাই দিনের শেষ ভাগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা, রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খাওয়া, ঘুমের এক ঘণ্টা আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করা এবং ঘর অন্ধকার করে ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মানসিক চাপও কর্টিসলের মাত্রা বাড়াতে পারে। তাই প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো, ডায়েরি লেখা ও মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ভূমধ্যসাগরীয় ডায়েট কি প্রদাহ কমায়?
ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসকে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা প্রদাহরোধী খাদ্যাভ্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৩ সালে ‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বয়স্ক ব্যক্তিরা ছয় মাস ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করার পর তাদের রক্তে প্রদাহের বিভিন্ন চিহ্নের মাত্রা কমেছিল। যারা আগের খাদ্যাভ্যাসই বজায় রেখেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।
পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট কি প্রদাহ বাড়ায়?
পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট তৈরির সময় শস্যের ব্র্যান ও জার্ম সরিয়ে ফেলা হয়। অথচ এসব অংশে ফাইবার, বি ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে। এগুলো বাদ যাওয়ার ফলে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট দ্রুত হজম হয় এবং রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে, যা প্রদাহের কারণ হতে পারে।
অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাবার কি রোগ সারায়?
অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাদ্যাভ্যাস আর্থ্রাইটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ সারিয়ে দেয়—এমন দাবি করা যায় না। তবে, হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পুষ্টি ও মহামারিবিদ্যার অধ্যাপক ডা. এডওয়ার্ড জিওভানুচ্চি বলেন, “অনেক রোগের সঙ্গে প্রদাহের সম্ভাব্য সম্পর্ক থাকায়, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি খাদ্যাভ্যাস একাধিক রোগের ক্ষেত্রে উপকারী হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।”
তার মতে, “এখন পর্যন্ত এটি হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস এবং কিছু ক্যানসারের কম ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখা গেছে।” অর্থাৎ প্রদাহরোধী খাবার খেলে আর্থ্রাইটিস বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ সেরে যাবে না। তবে, এগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে, যার ফলে ব্যথা, ফোলাভাব, শক্ত হয়ে থাকা ও ক্লান্তির মতো কিছু উপসর্গ কমতে পারে।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























