শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কার কী পরিচয়?

নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কার কী পরিচয়?

সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন করে চার পূর্ণমন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী শপথ নেওয়ার পর তাদের মধ্যে দায়িত্বও বণ্টন করা হয়েছে। পদোন্নতি পাওয়া এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে।


আর নতুন মন্ত্রীদের মধ্যে সাচিং প্রু জেরী পেয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং আন্দালিভ রহমান পার্থ পেয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। নতুন দুই প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র এবং শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এদিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, সাচিং প্রু জেরী, বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ ও রশিদুজ্জামান মিল্লাত পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।


আর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির ও গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।


তাদের অন্তর্ভুক্তির পর মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে। চলুন জেনে নিই নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কার কী পরিচয়-


আবদুল মঈন খান


নতুন মন্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের একজন আবদুল মঈন খান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে জায়গা পান তিনি।


১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরনগরদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. আবদুল মঈন খান। তার বাবা আবদুল মোমেন খান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের একজন ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী। বাবার হাত ধরেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মঈন খান। নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। পরে অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।


মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরের বছর বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী হন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন।


নরসিংদী-২ আসন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মঈন খান। ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রায় দুই দশক পর মন্ত্রী হিসেবে সরকারের দায়িত্বে ফিরলেন তিনি। এবার নিয়ে চতুর্থবার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পেলেন মঈন খান।


সাচিং প্রু জেরী


বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়েছেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির এই সদস্য দলটির বান্দরবান জেলা শাখার আহ্বায়কের দায়িত্বেও রয়েছেন।


সাচিং প্রু জেরী বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সন্তান। তার বাবা অং শৈ প্রু চৌধুরী ছিলেন বোমাং সার্কেলের ১৫তম রাজা ও রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাচিং প্রু জেরীর মামি মা ম্যা চিংও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।


১৯৫৩ সালের ১৫ জানুয়ারি বান্দরবান পৌরসভার ক্যাংভিটা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন সাচিং প্রু জেরী। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার বান্দরবান আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।


দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ২০০১, ২০০৯ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাচিং প্রু জেরী। এর আগে বান্দরবান সদর উপজেলা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।


পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদটি আগে পেয়েছিলেন দীপেন দেওয়ান। পরে তিনি পদত্যাগ করায় পদটি শূন্য ছিল। এবার সেই দায়িত্বে এলেন সাচিং প্রু জেরী।


আন্দালিভ রহমান পার্থ


বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ পেয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।


১৯৭৪ সালের ২০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন পার্থ। তার বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জু ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র। সেন্ট যোসেফ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যের লিংকনস ইন থেকে বার-এট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন পার্থ।


২০০৮ সালের ৬ এপ্রিল বাবার মৃত্যুর পর বিজেপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তিনি। একই বছর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা অ্যাডভোকেট ইউছুফ হোসেন হুমায়ুনকে পরাজিত করেন পার্থ।


২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আবারও ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন। এবার পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন বিজেপি চেয়ারম্যান।


এদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রী সমমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।


এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত


প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তাকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়েছে। এতদিন তিনি একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।


বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা ও জেলা বিএনপির সভাপতিও ছিলেন।


১৯৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের কালিকাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে জামালপুর-১ আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।


প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনের কয়েক মাসের মধ্যেই এবার পূর্ণমন্ত্রী হলেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত।


হুমায়ুন কবির


বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির নতুন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছিলেন।


২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিকবিষয়ক) হন হুমায়ুন কবির। জন্মসূত্রে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের হাবশপুর গ্রামের সন্তান হলেও দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠেন তিনি।


যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন হুমায়ুন কবির। এরপর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স থেকে রাজনীতিতে, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ থেকে ব্যবস্থাপনায় এবং লিডস ল’ স্কুল থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।


পেশাগত জীবনে লন্ডন মেয়রের দপ্তরে কৌশল সহকারী এবং লিউইশাম এক্সিকিউটিভ মেয়রের কার্যালয়ে কেবিনেট উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়েও দায়িত্ব পালন করেন। বরিস জনসনের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি টিমে এবং পরে ঋষি সুনাকের অধীনে একাধিক কেবিনেট মন্ত্রী ও বিশেষ উপদেষ্টার সঙ্গে প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন তিনি।


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আগে থেকেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। ফলে এখন এই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকছেন। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন খলিলুর রহমান।


শামীম কায়সার লিংকন


গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। ১৯৮০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।


তার বাবা আবদুল মোত্তালেব আকন্দ গাইবান্ধা-৪ আসনের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ২০০১ সালে ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাবার মৃত্যুর পর ২০০৬ সালে উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন শামীম কায়সার।


২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়ী হতে পারেননি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আবারও গাইবান্ধা-৪ আসনে জয় পান। ওই নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়েছেন।


শিক্ষাজীবনে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেন। পরে মালয়েশিয়ার আইআইএফ থেকে আইসিটিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এনআইআইটি থেকে ‘নেটওয়ার্ক ফাইন্যান্স অ্যান্ড এমআইএস’ বিষয়ে ডিপ্লোমাও করেছেন তিনি।


ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)। তার অধীনে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন শামীম কায়সার লিংকন।

সম্পাদক : আবদুল মাতিন