পাপ শুধু আখিরাতের শাস্তির ব্যাপার নয়—অনেক পাপ এমন আছে যার শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতেই দিয়ে দেন, যেন মানুষ সজাগ হয়, আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাওবা করে। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত দয়ালু; তাই তিনি কখনো কখনো গুনাহের শাস্তি দুনিয়ায় ত্বরান্বিত করে দেন বান্দাকে ধ্বংস থেকে বাঁচানোর জন্য, যাতে সে জীবনকে ঠিক পথের দিকে ফিরিয়ে নেয়। জীবনে যে কঠিন সময়গুলো আসে—রিজিকে সংকট, মন অস্থির, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, অশান্তি, অনাবৃষ্টি, রোগ-বালাই, সমাজে ফিতনা—এসব অনেক সময় মানুষের নিজেদের কর্মের।
কুরআনের আলোকে: কিছু পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই আসে
১. মানুষের কৃতকর্মের কারণে বিপর্যয়
মানুষের পাপ, অবিচার ও গোনাহ দুনিয়াতে বিভিন্ন বিপর্যয়ের কারণ হয়। আর তা নিজেদের কৃতকর্মের কারণে সংঘটিত হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন—
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ
‘স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের নিজেদের কৃতকর্মের কারণে।’ (সুরা রুম: আয়াত ৪১)
২. আল্লাহর অবাধ্যতার কারণে সংকট বৃদ্ধি পায়
অনেক কষ্ট, উদ্বেগ, অশান্তি—মানুষের পাপেরই ফল। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ
‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আপতিত হয়, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মেরই ফল।’ (সুরা শুরা: আয়াত ৩০)
৩. সমাজে অন্যায় হলে আল্লাহর শাস্তি দুনিয়ায় নামে
সমাজে ফিতনা, দুর্ভোগ—মানুষের নৈতিক পতনের ফল। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
‘আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ: আয়াত ১১)
৪. সুদ—দুনিয়ায় অশান্তি, দারিদ্র্য এবং ধ্বংস ডেকে আনে
সুদ গ্রহণ করলে দুনিয়াতেই বরকত চলে যায়— সুদের পাপের ফলে দুনিয়াতেই মানুষের জীবনে অশান্তি ও ক্ষতি নেমে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ
‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং সদকা বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৬)
হাদিসের আলোকে: যেসব পাপের শাস্তি দুনিয়ায় পাওয়া যায়
৫. বাবা–মায়ের অবাধ্যতার শাস্তি দুনিয়াতে ত্বরান্বিত হয়
বাবা-মায়ের প্রতি কষ্ট দেওয়া, অবহেলা করা মারাত্মক অন্যায় ও পাপ। দুনিয়ার জীবনেই এর ফল দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ الذُّنُوبِ يُؤَخِّرُ اللَّهُ مِنْهَا مَا شَاءَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، إِلَّا الْبَغْيَ وَعُقُوقَ الْوَالِدَيْنِ
‘সব গুনাহর শাস্তি আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত স্থগিত রাখেন; তবে জুলুম ও বাবা-মায়ের অবাধ্যতা—এ দুটির শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতেই ত্বরান্বিত করে দেন।’ (তাবারানি)
৬. জুলুম বা অত্যাচারের শাস্তি দুনিয়াতেই পাওয়া যায়
জুলুম করা মানুষ দুনিয়াতেই লাঞ্ছিত হয়। জুলুম অত্যাচারের শাস্তি মানুষ দুনিয়াতেই প্রত্যক্ষ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إنَّ الله لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ، فَإِذَا أخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ»، ثُمَّ قَرَأَ: وكذلك أخذ ربك إذا أخذ القرى وهي ظالمة إن أخذه أليم شديد
‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীকে অবকাশ দেন। অতঃপর যখন তিনি তাকে পাকড়াও করেন, তখন তাকে ছাড়েন না।’ তারপর তিনি এই আয়াত পড়লেন— যার অর্থ, ‘তোমার প্রতিপালকের পাকড়াও এরূপই হয়ে থাকে। যখন তিনি অত্যাচারী জনপদকে পাকড়াও করে থাকেন। নিশ্চয়ই তার পাকড়াও কঠিন যন্ত্রণাদায়ক।’ (বুখারি ৪৬৮৬, মুসলিম ২৫৮৩, তিরমিজি ৩১১০, ইবনু মাজাহ ৪০১৮, রিয়াদুস সালেহীন ২১২)
৭. ব্যভিচার—দুনিয়ায় মহামারি ও বিপদ ডেকে আনে
অশ্লীলতা, ব্যভিচার সমাজে রোগ-বালাই বাড়ায়। মহামারি ও বিপদ-আপদ ডেকে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ… إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الْوَبَاءُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ فِي أَسْلَافِهِمْ
‘কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়লে তাদের মধ্যে নতুন নতুন রোগ ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ে—যা পূর্বে দেখা যায়নি।’ (ইবনু মাজাহ ৪০১৯)
৮. পাপের কারণে রিজিক বন্ধ হয়ে যায়
গুনাহ বা পাপ মানুষের রিজিকের দরজা বন্ধ করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
‘মানুষ কখনো কখনো যে রিজিক পেতে ছিল—গুনাহের কারণে তা থেকে বঞ্চিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ ৪০২২)
যে কারণে দুনিয়ার শাস্তি মহান আল্লাহর রহমত
আল্লাহ তাআলা দুনিয়ায় শাস্তি দেন ধ্বংস করার জন্য নয় বরং বাঁচানোর জন্য। যাতে মানুষ আল্লাহর রহমত পেয়ে ধন্য হয়। ফলে মানুষ আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, দুনিয়ার শাস্তি—
> এটি মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে দেয়
> মানুষকে পাপ থেকে ফিরিয়ে আনে
> বড় শাস্তির আগেই সতর্ক করে
> হারানো বরকত কীভাবে ফিরে পাওয়া যায় তা শেখায়
> মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে সাহায্য করে
জীবনে যে কষ্ট, বিপদ বা অশান্তি আসে—সবই পাপের ফল নয়; কিন্তু অনেক সময় এগুলোই হয় সতর্কবার্তা, যা মানুষকে আবার আল্লাহর দিকে ডাক দেয়। যার অন্তরে ইমান আছে—সে বিপদের সময় নিজেকে বদলায়, তাওবা করে, ইস্তিগফার করে, নিজের ভুল খুঁজে নেয়। আল্লাহ চান না তার বান্দা ধ্বংস হোক; তাই তিনি দুনিয়ায় কিছু শাস্তি দিয়ে বান্দাকে ফিরিয়ে আনেন রহমতের ছায়ায়।
আমরা যেন সেই বান্দা হই— যে সতর্কবার্তা পেলে জেগে ওঠে, যে বিপদের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, আর যে তাওবার পথে ফিরে আসে। আর বেশি বেশি এ দোয়া করা—
اللَّهُمَّ ارْزُقْنَا تَوْبَةً نَصُوحًا وَاعْفُ عَنَّا يَا رَحْمٰنُ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুমারযুক্বনা তাওবাতুন নাসুহা ওয়া’ফু আন্না ইয়া রাহমান।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে গ্রহণযোগ্য তাওবা দান করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন, হে পরম দয়ালু।’ آمين يا رب العالمين
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























