রাজধানীতে প্রকাশ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ভাড়াটে শুটার ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। হত্যার পেছনে চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—সব দিক সামনে রেখেই তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে অন্তত দুই কিলারের মুখ শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে পশ্চিম তেজতুরি বাজার এলাকায় স্টার কাবাব হোটেলের দ্বিতীয় তলায় আলোচনা শেষে সহকর্মী আবু সুফিয়ান মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন মুছাব্বির। সিটি হোন্ডা সার্ভিস পয়েন্টের সামনে গলির মুখে পৌঁছালে আগে থেকে রেকি করা দুর্বৃত্তরা হঠাৎ গুলি চালায়। একটি গুলি লাগে তার ডান হাতের কনুইয়ের নিচে, আরেকটি পেটের ডান পাশে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর দুই শুটার কোমরে পিস্তল গুঁজে মেইন রাস্তা দিয়ে কারওয়ান বাজারের দিকে পালিয়ে যায়। তদন্তকারীরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডে ৫ থেকে ৬ জন অংশ নিয়েছিল, যাদের মধ্যে দুজন সরাসরি শুটার।
ঘটনার পর আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুই দুর্বৃত্তের চেহারা আংশিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ঘটনার আগে ও পরে পরিকল্পিতভাবে রেকি করা হয় এবং মিশন শেষে নির্দিষ্ট পথে পালিয়ে যায় খুনিরা। ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ বোর পিস্তলের তিনটি খালি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান, অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ, র্যাব ও ডিবিসহ একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে। পুলিশ আরও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছে। তদন্তে অগ্রগতির আশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
এ ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম তেজগাঁও থানায় ৪–৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৮টা ২০ মিনিটের দিকে আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা পথরোধ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় মুছাব্বিরকে বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের স্ত্রী দাবি করেছেন, রাজনৈতিক কারণে মুছাব্বিরকে আগেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর কিছু শত্রু তৈরি হয়েছিল বলে স্বামী তাকে জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের অভিযোগ, কমিটিতে বড় পদ ও কাউন্সিলর নির্বাচনে আগ্রহ দেখানোই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবের অনুসারী ছিলেন এবং আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতিতে ছিলেন। কাওরান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সঙ্গেও এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে মুছাব্বিরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজা-পূর্ব বক্তব্যে বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এর আগে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম দেয় স্বেচ্ছাসেবক দল।
এদিকে, হত্যার বিচার দাবিতে শনিবার (১০ জানুয়ারি) সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম



















