চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ গঠনের দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর কেটে গেছে প্রায় দেড় বছর। এই সময়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার ও সামিট আয়োজন করেছে সরকার; বিশেষ করে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি বা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে।
এসব আয়োজনে বিনিয়োগকারীদের ভালো সাড়া পাওয়ার কথা প্রচার করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। কিন্তু, এসবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বাস্তবে। উল্টো বিনিয়োগের পরিবেশে উদ্বেগ ও আস্থার সংকটের কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমে গেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে এ সময়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলানোর উচ্চাশা না দেখিয়ে, নিজেদের ঢোল না পিটিয়ে বরং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো সমাধানে কাজ করাটা অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুসারে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ৫৫ লাখ কোটি টাকা। জিডিপির আকার ৫০-৫৫ লাখ কোটি টাকা হলেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে নিবন্ধন বা বিনিয়োগে ইচ্ছা প্রকাশ এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে— যা দেশের মোট জিডিপির মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। যদিও সেবা সংযোগের বিলম্ব, জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য লজিস্টিক প্রতিবন্ধকতায় প্রকৃত বিনিয়োগ নিবন্ধনের অর্ধেক বা আরও কম।
বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরুর প্রাথমিক ধাপ নিবন্ধন। এরপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নেওয়া, অর্থায়ন সংগ্রহ, অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন বিনিয়োগকারীরা। এক্ষেত্রে নিবন্ধনের মাধ্যমেই বিনিয়োগকারীর আগ্রহের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে ভাটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য বলছে, সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডার কাছে ৯৭০টি প্রকল্পে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোভিডকালের চেয়েও গত অর্থবছরে দেশে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯০৫টি প্রকল্পে মোট ১ লাখ ৫ হাজার ২২৬ কোটি টাকার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করা হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছিল প্রায় ১২ শতাংশ। এর পরের ২০২০-২১ অর্থবছরে কভিডকালে প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯৫টি হলেও টাকার অংকে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন প্রায় ৩৮ শতাংশ কমে ৬৫ হাজার ৫৬৬ কোটিতে দাঁড়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের সংখ্যা ও বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ দুটোই বাড়ে। আলোচ্য অর্থবছরে ১ হাজার ১২৪টি প্রকল্পে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ১৬টি প্রকল্পে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করা হয়েছিল। আলোচ্য অর্থবছরে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছিল প্রায় ১৯ শতাংশ।
গত অর্থবছরে দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করা হয়েছে, তার মধ্যে ৮০৯টি প্রকল্পে ৫২ হাজার ৩৫ কোটি টাকার প্রস্তাব এসেছে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ৩২ শতাংশ এসেছে সেবা খাতে। তাছাড়া, এ সময়ে কেমিক্যাল খাতে ১৭ শতাংশ, বস্ত্র খাতে ১৪ ও প্রকৌশল খাতে ১০ শতাংশ বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬১টি প্রকল্পে মোট ১৪ হাজার ২২ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এ সময়ে নিবন্ধিত বিদেশি বিনিয়োগের ৫৫ শতাংশই এসেছে কেমিক্যাল খাতে। অন্যান্য খাতের মধ্যে আলোচ্য অর্থবছরে প্রকৌশল খাতে ২৫ শতাংশ, সেবা খাতে ৮ ও বস্ত্র খাতে ৫ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে।
দেশে যে তিনটি উপখাতে বিদেশি বিনিয়োগের হিসাব করা হয় তার মধ্যে রিইনভেস্টেড আর্নিংস ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের অংশটিই বড় থাকে। তবে, বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত প্রতিফলন পাওয়া যায় মূলত ইকুইটি ক্যাপিটালে, যা হলো নতুন মূলধন। বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ না আসায় এ হিস্যা কমই থাকে। গত অর্থবছরে বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পাশাপাশি ইকুইটি মূলধনের প্রবাহও কমেছে। আলোচ্য অর্থবছরে ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার ইকুইটি মূলধন দেশে এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ কম।
এফডিআই স্টক বিবেচনায় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগের উৎস দেশ চীন। প্রধান উপদেষ্টা বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন গত বছরের মার্চে। পরের মাসে বাংলাদেশে আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল চীনা বিনিয়োগকারীদের বিশাল এক বহর। এরপর বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী দেশটিতে সফরে যান জুলাইয়ে। ওই সময় তিনি সাংহাইয়ে বিডার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে নেতৃত্ব দেন।
সেখানে বাংলাদেশ-চায়না ইনভেস্টমেন্ট সেমিনার ২০২৫-এ প্রধান বক্তা হিসেবে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, টেক্সটাইল ও আইটি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান আশিক চৌধুরী। বিপুল বিনিয়োগের দৃশ্যমান আগ্রহের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গিয়েছিল এসব সফরে। যদিও গত অর্থবছরে দেশটির বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে ৮৯ শতাংশ। পাশাপাশি এ সময়ে দেশে চীনের নিট এফডিআই প্রবাহ কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
দেশভিত্তিক বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও জার্মানি শীর্ষে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ দেশগুলোর মধ্যে চীন ছাড়া আর কেউ শীর্ষ পাঁচে ছিল না। গত অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এরপর চীন থেকে এসেছে ৬২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব, যেখানে আগের অর্থবছরে এসেছিল ৫ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪১০ কোটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩১০ কোটি ও হংকং থেকে ২২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিরা বিনিয়োগ আকর্ষণে যেসব দেশ সফর করেছেন তার অনেকগুলো থেকে বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাবও কমেছে। ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর আশিক চৌধুরী গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, কাতার, চীন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও কোরিয়া সফর করেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র, ফেব্রুয়ারিতে জাপান, মার্চে যুক্তরাজ্য ও এপ্রিলে কাতারে (প্রধান উপদেষ্টার প্রতিনিধি দলে) গিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ চার দেশ সফর করেছেন তিনি। এর মধ্যে কাতার থেকে কোনো বিনিয়োগ আসেনি এবং যুক্তরাজ্য থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে বিনিয়োগ এসেছে তার চেয়ে বেশি প্রত্যাবাসিত হয়েছে। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় জাপান ও যুক্তরাজ্য থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে কাতার থেকে নতুন কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়নি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে উচ্চ সুদহারের কারণে বর্তমানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। তার ওপর জ্বালানি সংকটের কারণেও ভুগতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এ অবস্থায় সব বিনিয়োগকারীই নির্বাচিত নতুন সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে বিডার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটিতে জমা হওয়া বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণে যে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, সেটিকে কেবল একটি পরিমাণগত হ্রাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিডার মূল্যায়নে এটি বাস্তব বিনিয়োগ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রস্তাব পর্যালোচনা ও স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ায় গৃহীত একটি গুণগত ও বাস্তবমুখী সমন্বয়ের প্রতিফলন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল তার ৫২ শতাংশ শেষ পর্যন্ত দেশে প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়িত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রস্তাবিত অংকের তুলনায় প্রায় ১৪৪ শতাংশ। এর মানে হচ্ছে এ সময়ে নেওয়া প্রস্তাবগুলো অধিকতর বাস্তবসম্মত, প্রস্তুত ও বাস্তবায়নযোগ্য ছিল। গত অর্থবছর থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণে আরও কাঠামোবদ্ধ ও বাস্তবতানির্ভর যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে বিডা। ফলে, মোট প্রস্তাবের অংক কম হলেও তা বাস্তব বিনিয়োগ সক্ষমতার আরও সঠিক প্রতিফলন দিচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম



















