আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক বাংলাদেশে আসবেন। তাদের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ, বিমানবন্দরে হেল্প ডেস্ক, মিডিয়া সেল, নিরাপত্তা, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন বিষয়ে এক গুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশন ও একটি মন্ত্রণালয়ের সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের সভাপতিত্বে গত ২২ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আমন্ত্রিত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে আসা বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্তে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গত ২৬ জানুয়ারি ওই সভার কার্যবিবারণী পাঠানো হয় জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, তথ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এ ছাড়া বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআই, এনএসআই, সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এ কার্যবিবরণী পাঠানো হয়েছে।
বৈঠকের এই কার্যবিবরণী গত ২৬ জানুয়ারি প্রস্তুত করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন নির্বাচন কমিশনের সহকারী জনসংযোগ পরিচালক মো. আশাদুল হক।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়, সাতটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সার্ক, ওআইসি, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট, আনফেরিয়েল ওয়েব, আইআরআই, এনডিআই এবং ২৬টি দেশ থেকে মোট ৮৩ বিদেশি পর্যবেক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সার্ক ও ফেমবোসা জোটের ছয় দেশ থেকে তিনজন করে ১৮ জন, ২২টি একক দেশ থেকে দুজন করে ৪৪ জন এবং সাতটি আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিটির তিনজন করে ২১ জন আসবেন।
কার্যবিবারণীতে বলা হয়, স্বপ্রণোদিতভাবে যেসব বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক আসার জন্য আবেদন করেছেন তাদের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ও ভিসা প্রসেসের জন্য নির্বাচন কমিশন আবেদন স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। আবেদন এবং এর সঙ্গে থাকা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিধি মোতাবেক তাদের ভিসা দেবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিসাপ্রাপ্ত বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের তালিকা ইসিতে পাঠাবে। এই পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিতে গোয়েন্দা সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
ইসি বলছে, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ভিসা ফি প্রদানের সুবিধার্থে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে সোনালী ব্যাংকের একটি বুথ স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের একজন প্রতিনিধিকে ভিআইপি ডেস্কে ২৪ ঘণ্টাই রাখতে হবে। এর ফলে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবল নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হলো।
কার্যবিবরণী মতে, আমন্ত্রিত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে আসা পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য বিমানবন্দরে ভিআইপি ডেস্কের সুবিধা দেওয়া হবে। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। ইমিগ্রেশনের সময় তাদের প্রতি শিষ্টাচার আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের হয়রানি ও ভোগান্তি তৈরি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার সময় এদের পাসপোর্টে আবশ্যিকভাবে ‘ইলেকশন অবজারভার’ সিল দিতে হবে।
ইসি বলছে, বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা সঙ্গে করে যেসব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসবে দেশত্যাগের সময় সেগুলোর জন্য তাদের কোনো ধরনের শুল্ক দেওয়া লাগবে না। তবে ওইসব যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে রেখে গেলে কিংবা কোথায় ডোনেট করলে তাকে বিধি মোতাবেক শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে যাদের পূর্বে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি থাকবে তাদের শুল্ক দিতে হবে না। আর যারা শুল্ক দেবে তারা যাতে খুব সহজে দিতে পারে, তার জন্য বিমানবন্দরে ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে বলা হয়েছে।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সহায়তার জন্য বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের আগেই এয়ারপোর্ট হেল্প ডেস্ক চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ডেস্কটি ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চালু রাখা হবে। হেল্প ডেস্কে সিভিল এভিয়েশন, এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন, বিমানবন্দর, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, তথ্য, বিমান ও পর্যটন এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করবেন। এই সাত সেক্টর থেকে তিনজন করে কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হবে, ২৪ ঘণ্টাই তিন শিফটে রোস্টার ডিউটি পালন করবেন। তবে হেল্প ডেস্কে নবম গ্রেডের নিম্ন পদধারী কাউকে নিযুক্ত না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হেল্প ডেস্ক পরিচালনার সহায়তার জন্য সিভিল অ্যাভিয়েশন প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্টাফ নিয়োগ করতে পারবে।
আমন্ত্রিত পর্যবেক্ষকদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর অতিথিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রটোকল অফিসারদের কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যেসব পর্যবেক্ষকের ভিসা ফি মওকুফ করা হবে তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পররাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে।
বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরা কে, কোথায় পর্যবেক্ষণ করবেন তার তালিকা ইসি থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য ভোট গ্রহণের পাঁচ দিন আগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় মিডিয়া সেল স্থাপন করবে। এই মিডিয়া সেলে টেলিফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা রাখা হবে। সেল পরিচালনার জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ করবে।
কার্যবিবরণীতে বলা হয়, আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দেশি-বিদেশি সব সাংবাদিক, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন কমিশনের স্টেকহোল্ডারদের নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য, নির্বাচনের প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষকদের করণীয় এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ব্রিফ করা হবে। এই ব্রিফে আনুমানিক এক হাজার ২০০ জন মানুষ উপস্থিত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে ইসি।
ইসি বলছে, বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য বিমানবন্দরের হেলথ সেন্টার সার্বক্ষণিক খোলা রাখা হবে। আমন্ত্রিত পর্যবেক্ষকদের জন্য হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একজন ডাক্তার ও একজন নার্সের সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক হেলথ ইউনিট স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চারটি কেবিন, একজন ডাক্তার ও দুটি অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হবে। পাশাপাশি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দায়িত্বরত ডাক্তারের জন্যও একটি কক্ষের ব্যবস্থা থাকবে।
কার্যবিবরণী মতে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাড়ির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য মানসম্মত উপহারের ব্যবস্থা করবে কমিশন। তাদের প্রটোকল অফিসার হিসেবে ২০ জন থাকবে। এরমধ্যে নির্বাচন কমিশনের সাতজন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিনজন ও তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১০ জন কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করা হবে।
ইসি বলছে, ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নির্বাচন কমিশনের স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে রাতের খাবারের আয়োজন করা হবে। এখানে ৬০০ জন উপস্থিত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে ইসি। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের জন্য ইনফরমেশন কিট তৈরি করে সরবরাহ করা হবে।
গত ২৬ জানুয়ারি সকালে ইসির সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আশাদুল হকের সই করা পর্যবেক্ষকদের তালিকা অনুযায়ী, সংসদ ও গণভোট কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন সাত হাজার ৯৯৭ পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন ৪৭ হাজার ৭৫৭ জন পর্যবেক্ষক। সর্বমোট ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন। এর আগে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকবেন ৫০০ জন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম



















