বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে নারীদের অবদান একেবারে কম নয়। নানা সামাজিক বাধা, বৈষম্য এবং সুযোগের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অসংখ্য নারী গবেষণা, উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের মাধ্যমে মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছেন। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ নানা ক্ষেত্রে তাদের অবদান রেখে কেউ কেউ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এখানে এমনই ১০ জন বিশ্বখ্যাত নারী বিজ্ঞানীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো, যাদের কাজ বিজ্ঞানকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে।
১. অ্যাডা লাভলেস — গণিতবিদ
ইংরেজ গণিতবিদ ও লেখিকা অ্যাডা লাভলেসের জন্ম ১৮১৫ সালে। তার পুরো নাম অগাস্টা অ্যাডা বায়রন। তিনি মূলত চার্লস ব্যাবেজের প্রস্তাবিত কম্পিউটার ‘অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন’ নিয়ে কাজ করেন। অ্যাডা লাভলেসকে বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক কম্পিউটার আবিষ্কারের বহু আগেই তিনি এই কাজটি করেছিলেন। অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন সম্পর্কে তাঁর লেখা নোটগুলোকে প্রথম কম্পিউটার অ্যালগরিদম হিসেবে ধরা হয়। লাভলেসের কোনো আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। সেই সময়ে নারীদের শিক্ষালাভের সুযোগও সীমিত ছিল। তবু তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষা অর্জন করেছিলেন।
২. মেরি কুরি — পদার্থবিদ ও রসায়নবিদ
পোলিশ–ফরাসি বিজ্ঞানী মেরি কুরি তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। স্বামী পিয়েরে কুরির সঙ্গে মিলে তিনি তেজস্ক্রিয় উপাদান পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কার করেন। তিনি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বিচ্ছিন্ন করার কৌশলও উদ্ভাবন করেন।১৯০৩ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন (পদার্থবিজ্ঞান)। পরে রসায়নেও নোবেল পুরস্কার পান। ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি দুই ভিন্ন ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ভ্রাম্যমাণ এক্স-রে ইউনিট তৈরি করেন, যা আহত সৈন্যদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. জানকী অম্মল — উদ্ভিদবিজ্ঞানী
ভারতের প্রথম নারী উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের একজন জানকী অম্মল উদ্ভিদবিজ্ঞান ও কোষবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি মাদ্রাজ ও যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন। উইমেনস ক্রিশ্চিয়ান কলেজে শিক্ষকতা এবং সুগারকেন ব্রিডিং ইনস্টিটিউটে গবেষণার পাশাপাশি তিনি ইংল্যান্ডেও কাজ করেছেন। পরে তিনি ভারতে ফিরে এসে বোটানিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দেন। সাইটোজেনেটিকস, উদ্ভিদ প্রজনন ও ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানে অবদানের জন্য তিনি পদ্মশ্রীসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছিলেন।
৪. চিয়েন-শিউং উ — পদার্থবিজ্ঞানী
চীনে জন্ম নেওয়া চিয়েন-শিউং উ পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী বিজ্ঞানী। তিনি নানকিংয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা চালিয়ে যান।ম্যানহাটান প্রকল্পে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এনরিকো ফার্মির তেজস্ক্রিয় বিটা ক্ষয় তত্ত্ব পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন। তাঁর বিখ্যাত ‘উ এক্সপেরিমেন্ট’ পদার্থবিজ্ঞানের সমতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। ১৯৭৫ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স মেডেল এবং ১৯৭৮ সালে উলফ পুরস্কার লাভ করেন। তিনি আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির প্রথম নারী সভাপতি ছিলেন।
৫. ক্যাথেরিন জনসন — গণিতবিদ
মার্কিন গণিতবিদ ক্যাথেরিন জনসন নাসার মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বাধা অতিক্রম করে তিনি নাসায় কাজ করা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গণিতবিদদের একজন হন। মার্কিন মহাকাশ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ মিশন—যেমন বুধ গ্রহ অভিযান ও অ্যাপোলো–১১ চাঁদে অবতরণ—এর গণনামূলক কাজে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ২০১৫ সালে তিনি প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পুরস্কার পান। তাঁর জীবন ও কাজ ‘হিডেন ফিগারস’ চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে।
৬. রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন — রসায়নবিদ
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির মাধ্যমে তিনি ডিএনএর বিখ্যাত ‘ফটো ৫১’ চিত্র ধারণ করেন, যা ডিএনএর ডাবল হেলিক্স কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে তার এই অবদান দীর্ঘদিন যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। বছরের পর বছর এক্স-রে বিকিরণের সংস্পর্শে থাকার ফলে তিনি ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং ৩৭ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর চার বছর পর তাঁর সহকর্মীরা নোবেল পুরস্কার পান।
৭. ভেরা রুবিন — জ্যোতির্বিজ্ঞানী
ভেরা রুবিন ছায়াপথের ঘূর্ণন হার নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা করেন। তার গবেষণার মাধ্যমে ‘ডার্ক ম্যাটার’ ধারণার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি সহকর্মী কেন্ট ফোর্ডের সঙ্গে গবেষণা করে দেখান যে ছায়াপথের বাইরের অংশের নক্ষত্রগুলোও কেন্দ্রের নক্ষত্রের মতো দ্রুতগতিতে ঘোরে। এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটি বড় আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত।
রুবিন সারাজীবন বিজ্ঞানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে কাজ করেছেন এবং লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
৮. গ্ল্যাডিস ওয়েস্ট — গণিতবিদ
গ্ল্যাডিস ওয়েস্ট পৃথিবীর আকারের গাণিতিক মডেল তৈরির কাজ করেন, যা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। ভার্জিনিয়া স্টেট কলেজ থেকে গণিতে পড়াশোনা শেষে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীতে কাজ শুরু করেন। স্যাটেলাইট পরিমাপ ও মহাকর্ষীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার গবেষণা জিপিএস প্রযুক্তিকে নির্ভুল করতে সহায়তা করে।
২০১৮ সালে তাকে মার্কিন বিমানবাহিনীর স্পেস অ্যান্ড মিসাইল পাইওনিয়ারস হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
৯. ফ্লসি ওং-স্তাল — ভাইরাস বিশেষজ্ঞ
চীনে জন্ম নেওয়া ফ্লসি ওং-স্তাল যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন এবং ভাইরোলজির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি এইচআইভি ভাইরাস প্রথম ক্লোন করেন এবং এর জিনগত নকশা তৈরি করেন। এই গবেষণার ফলে এইচআইভি শনাক্ত করার প্রথম পরীক্ষা পদ্ধতি তৈরি সম্ভব হয় এবং এইডস নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যে তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০. জেনিফার ডাউডনা — জৈব রসায়নবিদ
জেনিফার ডাউডনা জিন সম্পাদনার যুগান্তকারী প্রযুক্তি সিআরআইএসপিআর/ক্যাস-৯ উদ্ভাবনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ফরাসি বিজ্ঞানী ইমানুয়েল শারপঁসিয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে ডিএনএ সম্পাদনা করতে পারেন, যা জেনেটিক রোগের চিকিৎসা ও জৈবপ্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এই আবিষ্কারের জন্য ২০২০ সালে তারা রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























