ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র তীরের জয়নুল আবেদিন উদ্যানের পাশে সার্কিট হাউস মাঠ। এর উত্তর পশ্চিম কোণে একটি মুচকুন্দ গাছ। সম্প্রতি এক সকালে মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখি সেই গাছে ফুটেছে বেশ কিছু ফুল। পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে। কিছু ফুল ঝরে পড়ে আছে মাটিতে। ফুল দেখতে ঠিক যেন আধখানা খোসা ছড়ানো কলা। রং ফ্যাকাসে হলুদ। তবে মনমাতানো গন্ধ। মিষ্টি নেশা ধরা সুবাস। অন্য নাম মুচকুন্দ চাঁপা। কেউ কেউ বলেন মুছকুন্দা। মুচকুন্দ চাঁপার গাছ কিন্তু দেখতে সুন্দর নয়।
মুচকুন্দ দীর্ঘাকৃতির চিরসবুজ বৃক্ষ। গাছ বাড়তে বাড়তে সোজা ওপরে উঠে যায়, মাথার দিকে কিছু ডালপালা হয়। পাতা দেখতে অনেকটা উদাল কিংবা উলটকম্বল পাতার মতো। পাতার আকৃতির জন্যই মুচকুন্দ চেনা সহজ। এই আয়তনের পাতা সেগুনের থাকলেও মুচকুন্দের পাতার আকৃতি ভিন্ন। বাকল ধূসর ও মসৃণ। পাতা বেশ বড়।
পাতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর এক পিঠ উজ্জ্বল সবুজ ও মসৃণ, অন্য পিঠ রুক্ষ-রোমশ ও সাদাটে ধূসর। ফুল ফোটার মৌসুম বসন্ত থেকে বর্ষাজুড়ে।
মুচকুন্দ চাঁপা আড়াল বেশি পছন্দ করে। তবে পুষ্পপ্রেমীদের নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। ফুল বাসি হলে ঝরে পড়ে। পুরো মুচকুন্দ গাছের তলা বাসি ফুলে ছেয়ে যায়। এভাবেই মুচকুন্দ সংগ্রহ করতে হয়।
মুচকুন্দের বৈজ্ঞানিক নাম Pterospermum acerifolium। Pterospermum গ্রিক শব্দ। এর অর্থ পক্ষল বীজ। Acerifolium অর্থ ম্যাপলপত্রী। এটি Malvaceae পরিবারের সদস্য। এই বৃক্ষ ইংরেজিতে Maple leaf bayur tree নামে পরিচিত। এক সময় দেশের আনাচেকানাচে বা যে কোনো জঙ্গলে দেখা গেলেও এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় এর পাতায় মুড়িয়ে প্যাকেটে গুড় বিক্রি হতো।
বিশাল গাছের পাতা গোলাকার বলা যায়। গাছের উচ্চতা ৫০-৬০ ফুট হয়ে থাকে। উচ্চতার জন্য গাছে ফুল দেখা কঠিন। ফুলের কলি আঙুলাকৃতির, দীর্ঘ গোলাকার ও বাদামি-হলুদ রঙের। ফুটে যাওয়া মুচকুন্দের ৫টি মুক্ত বৃত্তাংশ মাংসল ও রোমশ। সুগন্ধের উৎস ফুলের বৃতি। শুকনো ফুলের বৃতির সুগন্ধ অটুট থাকে। এই ফুলের গন্ধ অনেক দূর যায়। এই গন্ধই পতঙ্গকে আকর্ষণ করে এবং ফুলের পরাগায়ন হয়। পাপড়ির রং দুধসাদা, বেশ কোমল ও ফিতা আকৃতির। পরাগচক্র সোনালি সাদা, একগুচ্ছ রেশমি সুতার মতো নমনীয় ও উজ্জ্বল।
ফুল ঝরে পড়ার পরপরই আসে ফল। ফল বড়, ডিম্বাকৃতির, কাঠের মতো শক্ত এবং বাদামি রোমে ঢাকা। ফল পরিপক্ব হলে পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ফেটে যায়। বীজ বাদামি ও পক্ষল। পাখা থাকার কারণে বীজ সহজে বাতাসেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। কাঠ দৃঢ়, পালিশযোগ্য, দীর্ঘস্থায়ী। তক্তা বানানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। হাত-পা জ্বালাপোড়ায় পাতার ডগা ভেজানো রস উপকারী। ফুল জীবাণু ও কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকল ও পাতা বসন্ত রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়। পোকামাকড় কামড়ে দিলে এই গাছের পাতার রস লাগালে ব্যথা ভালো হয়।
মুচকুন্দ চাঁপার আদি নিবাস হিমালয়ের পাদদেশ, মিয়ানমার, আসাম ও চট্টগ্রামের পার্বত্যাঞ্চল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরোনো ভবন, শিশু একাডেমি, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও ঢাকার বলধা বাগানে মুচকুন্দ চাঁপা গাছ রয়েছে। শিল্পী এসএম সুলতানের প্রিয় ফুল ছিল মুচকুন্দ চাঁপা। সে জন্য সাতটি মুচকুন্দ চাঁপা তিনি যশোরে মাইকেল মধুসূদন কলেজ ক্যাম্পাসে রোপণ করেছিলেন।
বিশেষ প্রতিনিধি | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























