বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

বৃষ্টিতে নষ্ট বীজতলা, দ্বিগুণ দামে চারা কিনতে হচ্ছে কৃষকদের

বৃষ্টিতে নষ্ট বীজতলা, দ্বিগুণ দামে চারা কিনতে হচ্ছে কৃষকদের

“দশ শতক জমিত বেচন (বীজ) ছিটাছিনু, ঝড়ির পানিত তাক তলি যায়্যা পচি গ্যাছে। এ্যাখোন ৩ বিগা জমিত আমোন ধান নাগামু। এ্যাই জন্যে হাটোত বেচন (ধানের চারা) কিনবার আছছি। সাড়ে ৭০০ ট্যাকা করি দশপণ বেচন সাড়ে সাত হাজার ট্যাকা দিয়্যা কিননু। ইজারাদারের নোক টোল নিলো ২০০ ট্যাকা। এ্যাগলা এ্যাখোন ভ্যানোত (ভ্যান) করি বাড়িত নিয়্যা যাবার ভাড়া, জমি হাল-চাষের খরচা, বেচন নাগাবার কামলার দাম, সার-ওষুদ (কীটনাশক) কেনার ট্যাকা, নিরানি কামলা খরচা। শোগশুদ্ধা (সবসহ) এ্যাবার যে খরচ হবে, আমোন ধান বেচি তাক উঠপার নয়।”


সম্প্রতি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর হাটে আমন ধানের চারা কিনতে এসে এসব কথা বলেন সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষি রাঙ্গা মোল্লা।


সম্প্রতি টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি আর উজানের ঢলে জেলার আমন ধানের বীজতলা পানিতে ডুবে গিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ। ধানের চারা তাদের বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে দ্বিগুণ দাম দিয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।


জেলাজুড়ে আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই রোপণ কার্যক্রম চলবে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, গাইবান্ধায় চলতি মৌসুমে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর। এসব জমিতে ধান রোপণের জন্য ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে আমন বীজতলা করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। এর মধ্যে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর। তবে বাস্তবে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।


জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করা হয়। এসব আমনের চারা শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রোপণ করা হয়। গত জুলাই মাসে দুই সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।


নদ-নদীর পানিও বাড়তে শুরু করে। ফলে জেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব বীজতলা পানির নিচে ডুবে যায়। তবে যেসব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো, সেসব এলাকায় বৃষ্টি থামার দুই-এক দিনের মধ্যে জমি থেকে পানি নেমে যায়। অপরদিকে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় বীজতলা পুরোপরি পানির নিচে ডুবে পচে গেছে।


কৃষকদের অভিযোগ, জেলার পানি নিষ্কাশনের অধিকাংশ খাল-বিল এখন প্রভাবশালীদের দখলে। এসব খাল-বিল ভরাট করে কেউ বাড়ি, কেউ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। অনেকেই এই উন্মুক্ত সরকারি খাল-বিলে পানি প্রবাহ বন্ধ করে মাছ চাষ করছেন, আবার কেউ ফসল চাষ করছেন। এতে পানি নিষ্কাশন ও প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে বৃষ্টি বা বন্যার পানি সময়মত সরছে না।


পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া বলেন, এ বছর প্রায় আট বিঘা জমিতে আমন চাষের জন্য ২৫ শতক জমির বীজতলা তৈরি করেন। প্রায় ২০-২২ দিনের চারা এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে থেকে পচে যায়। এখন হাট থেকে বেশি দামে চারা কিনে জমিতে রোপণ করছেন।


সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি শান্তিরাম গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওসমান গনি বলেন, সরকারিভাবে কৃষকদের প্রণোদনার ব্যবস্থা না করলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এ বছর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।


একই কথা বলেন, গাইবান্ধা সদরের বল্লমঝাড় ইউনিয়নের বর্গাচাষি সৈয়দ আলী।


কৃষি সম্প্রসারণ গাইবান্ধা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী বলেন, বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।


তিনি বলেন, আগামী রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষককে কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনার বীজ-সার প্রদানের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সম্পাদক : আবদুল মাতিন