রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কিউআরএস এর বিবৃতি

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কিউআরএস এর বিবৃতি

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে কুইক রেসপন্স সাপোর্ট (কিউআরএস) টিম।

 ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস) এর সহায়তায় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ভয়েস কর্তৃক নথিভুক্ত সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতা ও অন্যান্য অধিকার লঙ্ঘনের মোট ৯৪টি ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে জানুয়ারিতে ৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৯টি, মার্চে ৯টি, এপ্রিলে ২৪টি, মে মাসে ২৪টি এবং জুনে ৯টি ঘটনা ঘটেছে।


 এই ধরনের অধিকার লঙ্ঘন কেবল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেই না, বরং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্য অধিকার এবং সার্বিকভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সুরক্ষার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা জোরদার করা, সহিংসতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে কিউআরএস সকল অংশীজনকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে গণমাধ্যমকর্মীরা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

গত ৩ মাসের প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে আমরা দেখতে পাই যে, এই সহিংসতার ঘটনাগুলো পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টিকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। যশোরে মাদক পাচারের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন দৈনিক যশোর বার্তার সাংবাদিক এবং শার্শা উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আতিকুজ্জামান রিমু। মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা নতুন কিছু নয়। সাভারে মাদক পাচারের তথ্য সংগ্রহকালে এসএ টিভির সাংবাদিক সাদ্দাম হোসেন, তাইফুর রহমান তুহিন, দেশ টিভির মনিরুল হক কাইয়ুম এবং গাড়িচালক জয়নাল আবেদীন গুরুতর আহত হন।

সাংবাদিকরা কেবল মাদক পাচারের খবর প্রকাশের জন্যই নয়, বরং দুর্নীতি এবং সরকারি প্রকল্পের অনিয়ম বা অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের কারণেও হামলার শিকার হচ্ছেন। মানিকগঞ্জে একটি কালভার্ট নির্মাণে অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আনন্দ টিভির সাংবাদিক ওবায়দুর রহমান নির্যাতনের শিকার হন। হামলায় তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে এবং তিনি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যায় ভুগছেন বলে জানা গেছে। আরও একটি ঘটনায় আমরা দেখতে পাই যে, মিরপুরে একটি উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদ সংগ্রহের সময় বাংলাদেশ প্রতিদিন এর নেহাল আহমেদ প্রান্ত এবং বাংলাদেশ টাইমস এর তাসবির ইকবাল নামে দুই সাংবাদিক পুলিশের মারধরের শিকার হন। 

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকরা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতেও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। 

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। খাগড়াছড়িতে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের একটি হামলার মামলায় অভিযুক্ত করার পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও সময় টিভির প্রতিনিধি সাংবাদিক জিতেন বড়ূয়াকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। এই ধরনের ঘটনা একটি ভীতি ও হুমকির পরিবেশ তৈরি করে, কারণ শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য সাংবাদিকদের রাজনৈতিক তকমা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনুরূপ একটি চিত্র দেখা গেছে দৈনিক সকাল এর সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান শিশিরের ক্ষেত্রে; নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের অভিযোগে একটি অনুষ্ঠান কাভার করার সময় তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। এই ধরনের ঘটনা একটি ভীতি ও হুমকির পরিবেশ তৈরি করে, যা সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে।

তাছাড়া, জার্মানির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জার্মান প্রেস এজেন্সী (ডিপিএ) এবং ওভারসিজ করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ওসিএবি) এর সাংবাদিক নজরুল ইসলাম মিঠুকে গোয়েন্দা আপত্তির অজুহাতে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয় এবং বিদেশ ভ্রমণে বাধা দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি সাংবাদিকদের অবাধ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের ঝুঁকিকে চিহ্নিত করে এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

আবার লক্ষণীয় যে, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করতে ডিজিটাল আইনের ব্যবহার উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বগুড়ায় এলজিইডি প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর অগ্রযাত্রা প্রতিদিন এর সাংবাদিক রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও পরবর্তীতে তিনি জামিন পান, তবে এই ধরণের গ্রেপ্তার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার চর্চার ওপর একটি নেতিবাচক বা ভীতিকর প্রভাব ফেলে।

সামগ্রিকভাবে, এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আইনি হয়রানি এবং অন্যান্য বিধিনিষেধের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। এই ধরনের পদক্ষেপ ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে, তথ্যের সহজলভ্যতাকে সীমিত করে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে।

কিউআরএস বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাংবাদিকদের ওপর হওয়া সমস্ত হামলার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করার, দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা জোরদার করার জোরালো আহ্বান জানাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করে এমন যেকোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জনগণের তথ্য অধিকার এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়া অপরিহার্য। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার, গণমাধ্যম এবং সুশীল সমাজের মধ্যকার যৌথ প্রচেক্ষাকে সমর্থন দিতে কিউআরএস সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


* কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম (কিউআরএস) হলো সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আদিবাসী অধিকারকর্মী এবং শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্ল্যাটফর্ম, যা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে। এই উদ্যোগটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ, নথিভুক্তকরণ এবং প্রতিক্রিয়া প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতে নির্ধারিত কাঠামোর আলোকে কিউআরএস নিয়মিতভাবে মাসিক অথবা ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

কিউআরএস টিমের সদস্যরা হলেনঃ

- সোহরাব হাসান, সিনিয়র সাংবাদিক;

- আজিজুল পারভেজ, সাংবাদিক;

- আফরোজা সোমা, মিডিয়া এন্ড জেন্ডার গবেষক;

- মায়নুল হাসান সোহেল, সাংবাদিক; 

- দীপ্তি চৌধুরী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব;

- মনজুর রশীদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি;

- ডালিয়া চাকমা, আদিবাসী অধিকারকর্মী;

- শারাবান তহুরা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি; 

- ইসমাইল হোসেন, সাংবাদিক।

-প্রেসবিজ্ঞপ্তি


সম্পাদক : আবদুল মাতিন